সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
শিরোনাম: ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব নিয়োগ বাতিল      হামের উপসর্গে আরও চার প্রাণহানি, মোট মৃত্যু সাড়ে ৬০০ ছাড়াল      জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু বাংলাদেশের      ভেস্তে গেল অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করার স্বপ্ন      বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারে আগ্রহী ফ্রান্স      বেনজীর কীভাবে গ্রেপ্তার এবং সবশেষ কোথায় আছেন, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার      
খোলাকাগজ স্পেশাল
কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যা
আপিলে ঝুলে থাকছে নিম্ন আদালতের রায়
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৯:৩৬ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কন্যাশিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে বেড়েছে উদ্বেগ। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় দ্রুতবিচার ও শাস্তির রায় কার্যকর নিয়েও জনমনে জন্ম নিচ্ছে ক্ষোভ। এরই মধ্যে শিশু ধর্ষণ মামলার আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেছেন, শুধু বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় দিলেই হবে না, উচ্চ আদালতেও এসব মামলার দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তার মতে, বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে অপরাধীরাও আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সময় পার করছে। গতকাল শুক্রবার সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা বলেন।

সাম্প্রতিক পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের জন্য এমন শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে অপরাধীরা ভয় পায় এবং মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসে। তবে তিনি মনে করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দ্রুতবিচার নিশ্চিত করা।

আসিফ নজরুল বলেন, আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার মাত্র ছয় কার্যদিবসে শেষ হয়েছিল। কিন্তু এরপর মামলাটি উচ্চ আদালতের আপিল প্রক্রিয়ায় আটকে আছে। ফলে এক বছর পার হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। একই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে রামিসা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আসিফ নজরুলের মতে, প্রধান বিচারপতি চাইলে হাইকোর্টে এক বা দুটি নির্দিষ্ট বেঞ্চকে শুধু শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আপিল শুনানির দায়িত্ব দিতে পারেন। একইভাবে আপিল বিভাগেও সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এসব মামলার শুনানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আপিল নিষ্পত্তি সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ‘মানুষ আর অপেক্ষা করতে পারছে না। শিশু ধর্ষকদের দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।’

আছিয়া হত্যার ফাঁসির রায় হলেও এখনো হয়নি বাস্তবায়ন : মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কার্যকর হয়নি মৃত্যুদণ্ডের রায়। এতে হতাশ ও ক্ষুব্ধ আছিয়ার পরিবার। শিশুটির মা আয়েশা খাতুন বলছেন, ‘মেয়েটা মারা গেছে অনেক আগেই, কিন্তু এখনো খুনির ফাঁসি দেখলাম না।’ গত বছরের এই ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। বিচারিক আদালত প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের আপিলে আটকে আছে। ফলে কবে রায় কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পরিবার।

আছিয়ার মা আরও বলেন, ‘খুনি জেলে বসে ভালো আছে, আর আমরা প্রতিদিন কষ্ট নিয়ে বাঁচছি। এত দেরি হলে ভয় হয়, শেষে যদি বিচারই না পাই।’ ২০২৫ সালের ৫ মার্চ বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি। ঘটনার পর সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। তবে এক বছর পার হলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। বাদীপক্ষের আইনজীবী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হিটু শেখের করা আপিল এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। তারা দ্রুত শুনানি শেষে রায় কার্যকরের আশা করছেন।

এখনো কার্যকর হয়নি সিরিয়াল ধর্ষক ও কিলার রসু খাঁর ফাঁসি : চাঁদপুরের মেঘনা পাড়ের এক আতঙ্কের নাম ছিল রসু খাঁ। ১১ জনেরও বেশি অসহায় নারীকে ফাঁদে ফেলে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে আদালত তাকে একাধিকবার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। তবে বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ও ধর্ষকের ফাঁসি এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কেন থমকে আছে এই দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া? কী তার মামলার বর্তমান আইনি পরিস্থিতি?

আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রসু খাঁর মামলাগুলো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চাঁদপুরের আলোচিত পারভীন আক্তার হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন মহামান্য হাইকোর্ট। এই রায় ঘোষণার পর থেকেই আইনি বেড়াজালে বন্দি রয়েছে ফাঁসির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া। বর্তমানে এই সিরিয়াল কিলার গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে কনডেম সেলে অন্যান্য ফাঁসির আসামিদের সঙ্গে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। আদালতে নেওয়া হচ্ছে রসু খাঁকে। তাকেসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এদিকে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো আসামির ফাঁসি কার্যকর করার আগে বেশ কিছু দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক ধাপ পার হতে হয়। রসু খাঁর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফাঁসি আটকে থাকার মূল কারণগুলো হলো— ১. আপিল বিভাগের চূড়ান্ত শুনানি, ২. রিভিউ আবেদন ও ৩. রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রসু খাঁর মামলার এই দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতাগুলো এখনো পুরোপুরি শেষ না হওয়ার কারণেই তার ফাঁসির দণ্ড চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা যাচ্ছে না। আইনজীবীদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সব আইনি প্রক্রিয়া এবং রিভিউ নিষ্পত্তি হওয়ার পরেই কেবল এই কুখ্যাত অপরাধীর দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হবে, যার জন্য অপেক্ষা করছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

বিচার চাইলেন দেড় মাস আগে প্রাণ হারানো নিশাতের বাবা : রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার রামিসার বাসায় এসেছেন দেড় মাস আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্মমভাবে হত্যার শিকার শিশু নিশাতের (৬) বাবা আবু সাদেক মিয়া। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রামিসার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দেড় মাস হলো বাচ্চাটা মারা গেছে, আমার ঘুম আসে না। ফেসবুকে যখন দেখলাম (রামিসার ঘটনা), তখন ভাবলাম বাচ্চাটার বাবা-মায়ের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েটাকে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে, হাত-পা ভেঙে, নির্যাতন করে মারা হয়েছে। মামলা করার পরও এখন পর্যন্ত কোনো কিছুই হয়নি। আজ প্রায় দেড় মাস হলো, চার্জশিট এখন পর্যন্ত দেয়নি।’

তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কি বলব, আর ভাষা তো নেই। এসব হত্যার বিচার চাই। ফাঁসি চাই। সরকারের কাছে দ্রুত বিচার চাই।’

উল্লেখ্য, গত ১৫ এপ্রিল দোকান থেকে চিপস কেনার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় শিশু নিশাত। সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের স্থানীয় একটি স্কুলের নার্সারি বিভাগের ছাত্রী ছিল। অনৈতিক কাজে বাধা দেওয়ায় ইসহাক মিয়া নামে এক প্রতিবেশী শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে। নিখোঁজের দুই দিন পর ১৭ এপ্রিল দুপুরে বাড়ির পাশের একটি খোলা জায়গা থেকে নিশাতের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে নিশাতের মা আকলিমা আক্তার বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে দেশে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট হলেও মূল সংকট সঠিক প্রয়োগ নিয়ে বলে মনে করছেন সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ। তিনি বলেন, আইনের কোনো ঘাটতি না থাকলেও বাস্তব সমস্যা হলো তদন্তের দুর্বলতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি। অধিকাংশ মামলার তদন্ত সঠিকভাবে না হওয়ায় অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতা দেখা যায়। এতে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায় বা মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের আইন প্রয়োগে অদক্ষতা এবং অনিয়মের অভিযোগও এর জন্য দায়ী। তার ভাষ্য, তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে ত্রুটি থাকলে বিচারকের সততা ও নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যায়।

বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে ইকতেদার আহমেদ বলেন, বিচারকের সংখ্যা ও মামলার সংখ্যার মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। এ কারণে বিচার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়, যা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে আরও কঠিন করে তোলে। তবে চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত মামলার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে দ্রুত তদন্ত ও বিচার শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  কন্যাশিশু   ধর্ষণ   হত্যা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close