রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন মাঠে নেমেছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবির পাশাপাশি রামিসার মতো সংবেদনশীল ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল ও দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগও উঠছে বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে।
রামিসা ইস্যুকে ঘিরে সরকারের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। পাশাপাশি দলটির শীর্ষ নেতারাও অপরাধীকে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে সরকারকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। এ ছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে।
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বিষয়টিকে নিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ফেসবুক পোস্টে নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
তবে রামিসা ইস্যুকে ঘিরে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক ও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, রামিসার হত্যাকারীর ফাঁসি ও সর্বোচ্চ শাস্তি বিএনপিও চায়। তবে এই ঘটনাকে পুঁজি করে কোনো গোষ্ঠী যেন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বা উসকানি দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। গত শুক্রবার রাজধানীর পল্লবীস্থ ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কার্যালয়ে এক যৌথ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘রামিসা হত্যাকাণ্ডে আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসি চাই।’
রামিসা হত্যা নিয়ে রাজনীতি
পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার ঘটনাটি নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয় কর্মসূচি পালন করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক কর্মসূচি ও তীব্র প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। দলটির শীর্ষ নেতারা একে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াত’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি তুলেছেন এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন করছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। দলটির নেতারা নিহতের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ঘটনার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দেন।
দোষীদের দ্রুত বিচার ও প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবিতে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম ও মিরপুরের পল্লবী এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলও করে জামায়াত। জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তর ও চট্টগ্রাম মহানগরী মহিলা বিভাগসহ বিভিন্ন শাখা প্রতিবাদ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এই হত্যাকাণ্ডের জন্য বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যর্থতাকে দায়ী করেন। আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার আহ্বান জানান তিনি। গত বুধবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশে এ আহ্বান জানান গোলাম পরওয়ার।
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, ‘আজ দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই। শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড জাতির জন্য লজ্জার। দ্রুত ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে হত্যাকারীর ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করতে হবে।’
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন অতি দ্রুত মানবতাবিরোধী অপরাধের আদলে রামিসা হত্যার বিচার দাবি করেছেন।
ইসলামী ছাত্রীসংস্থাসহ দলটির অন্যান্য অঙ্গসংগঠনও বিচার চেয়ে রাজপথে অবস্থান নেয় এবং দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর আইনের প্রয়োগ দাবি করে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রামিসাসহ সব ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে মিরপুরে মশাল মিছিল করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নিষিদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রামিসা ইস্যুকে ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ফেসবুক পোস্টে সংগঠনটি নিরাপত্তাহীনতা ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থ প্রশাসনের এবং বিচারহীনতায় নিমজ্জিত সমাজের জঘন্যতম প্রতিচ্ছবি এটি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্রতম ঘৃণা, ক্ষোভ ও বজ্রকঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
এদিকে ধর্ষণ আইন সংস্কার জোটের পক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে।
তবে রামিসার হত্যাকে নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর। ‘আউটস্পোকেন আনিস আলমগীর’ নামক পেজে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ধর্ষণের মতো একটি স্পর্শকাতর ও জঘন্য অপরাধকে কেন্দ্র করে এখানে নোংরা রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, ধর্ষণ এবং হত্যার শিকার শিশু রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতরাতে (বৃহস্পতিবার) মিরপুরের রামিসার বাসায় গিয়েছিলেন। দেখলাম গাড়িতে ওঠার সময় সেখানে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। আজ (শুক্রবার) দেখলাম শিবির রাস্তায় নেমেছে মিরপুরে। তুলকালাম! অথচ, এই ধর্ষণকাণ্ডে এখনো পর্যন্ত আমি সরকারের কোনো গাফিলতি দেখলাম না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ধর্ষণের মতো একটি স্পর্শকাতর ও জঘন্য অপরাধকে কেন্দ্র করে এখানে নোংরা রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
এদিকে রামিসা হত্যার বিচার নিয়ে জামায়াত-এনসিপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট করা রাশেদ খাঁন। গত বৃহস্পতিবার রাতে ফেসবুকের এক পোস্টে তিনি এই চ্যালেঞ্জ দেন।
ওই পোস্টে রাশেদ খাঁন লেখেন, “জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি কি প্রকাশ্যে বা পাথর মেরে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর চায়? চাইলে তারা বিবৃতি দিক বা সাংবাদিক সম্মেলন করে বলুক।”
এদিকে শিশু রামিসার হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি আগামী ১ মাসের মধ্যে নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।’ গতকাল শনিবার ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী এমন ঘোষণা দেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধে চূড়ান্ত অবক্ষয়ের প্রমাণ মিলেছে। এ বিষয়ে একটি কথা আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি পরিষ্কারভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। এই ধরনের শিশু নির্যাতন বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না।’
তিনি আগামী ১ মাসের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিতের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘যাতে করে ভবিষ্যতে আর কোনো ব্যক্তি এভাবে শিশু বা নারী নির্যাতন করার সাহস না পায়।’
কেকে/এলএ