দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা)। সংসদীয় গণতন্ত্র চালুর পর এই প্রথম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থী জয়ী হতে পারেননি। এমনকি নির্বাচনে কোথাও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই আসতে পারেননি দলটি। বিশেষ করে দলটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি রংপুর বিভাগেও ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দলটি। যার ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন— জাতীয় পার্টি এখন কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
তবে সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়কর ফলের পর এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। জাপার নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন— জাতীয় রাজনীতিতে দুর্বল হয়ে পড়লেও স্থানীয় পর্যায়ে এখনো কিছু সাংগঠনিক ভিত্তি ও ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে তাদের। সেই জায়গা থেকেই পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে চায় জাপা।
দলীয় সূত্রমতে— চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের নির্দেশনায় আসন্ন সব সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের এখন থেকেই মাঠে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদেরও নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগ বাড়াতে বলা হয়েছে।
দলটির নেতাদের ভাষ্য— জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের প্রভাব কমে গেলেও স্থানীয় নির্বাচনে ব্যক্তি পরিচিতি, সামাজিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলটির জন্য ‘বাঁচা-মরার লড়াই’ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্ব সংকট ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে স্থানীয় নির্বাচনেও সাফল্য পাওয়া সহজ হবে না। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কর্মীসংখ্যা কমে যাওয়া এবং একের পর এক ভাঙনের প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনেও পড়বে।
তাদের মতে, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও কার্যত নির্ভরশীল দল হিসেবে রাজনীতি করতে গিয়ে জাতীয় পার্টি নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়েছে। আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে দলটির বিরুদ্ধে। ফলে সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ ধীরে ধীরে জাপা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত হলেও এবার আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকও জাপার পাশে দাঁড়ায়নি। অন্যদিকে নিজেদের ঐতিহ্যগত ভোটারদেরও ধরে রাখতে পারেনি দলটি। এর ফলে নির্বাচনে চরম মূল্য দিতে হয়েছে জাতীয় পার্টিকে।
তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই জাতীয় পার্টি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ে। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে কয়েকজন ‘হেভিওয়েট’ নেতাকে নিয়ে নতুন একটি জাতীয় পার্টি গঠিত হয়। এরশাদ জীবিত থাকাকালেও জাতীয় পার্টি একাধিকবার বিভক্ত হয়েছিল। তবে প্রতিবারই এরশাদের নেতৃত্বাধীন অংশ মূল জাতীয় পার্টি হিসেবে টিকে ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর দলটি কার্যত নেতৃত্ব সংকটে পড়ে।
এরশাদের জীবদ্দশায় স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জি এম কাদেরের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থাকলেও তিনি সমন্বয় করে দল পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যুর পর সেই ভারসাম্য আর থাকেনি। রওশন এরশাদের অনুসারীদের আলাদা ধারা এখনো বিদ্যমান। যদিও অসুস্থতার কারণে তিনি অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জি এম কাদেরকেই মূল অংশীদার হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ায় রওশনপন্থিরা আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল হিসেবে ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় করেছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। গত বুধবার (১৩ মে) দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) এ নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়া হয়। দলের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের পক্ষে এ হিসাব জমা দেন দলটির অতিরিক্ত মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভুঁইয়া।
জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির হয়ে মোট ১৯৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে দলের পক্ষ থেকে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত প্রচারণার জন্য কোনো বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। নির্বাচনি প্রচারণা বাবদ জাতীয় পার্টি মোট ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচ করেছে বলে জানিয়েছে।
অন্যান্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি উল্লেখ করে জানিয়েছে, নির্বাচনের সময় জনসভা আয়োজনের পেছনে তাদের খরচ হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এছাড়া নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্টাফ খরচ বাবদ দলটি ব্যয় করেছে আরও ৬৫ হাজার টাকা।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া এ প্রতিবেদনে জাতীয় পার্টি আরও জানিয়েছে, প্রাইম ব্যাংক পিএলসি’র বনানী শাখার একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সব ধরনের নির্বাচনি লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা জমা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কেকে/এলএ