মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ঈদের ছুটিতে বাড়তে পারে হামের প্রকোপ
শরীফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: রোববার, ২৪ মে, ২০২৬, ৯:৪২ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ঈদের ছুটি, আর সেই সঙ্গে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে লাখো মানুষ। তবে এ উৎসবের আমেজের মাঝেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ছোঁয়াচে রোগ ‘হাম’। ঈদযাত্রায় গণপরিবহনের উপচেপড়া ভিড় এবং ঈদের সামাজিক জনসমাগমের কারণে দেশজুড়ে হাম আক্রান্ত রোগী বাড়ার বড় ধরনের শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে টিকাহীন শিশু ও গর্ভবতী নারীরা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি থেকে ছড়ানো এ রোগ যেন উৎসবের আনন্দকে বিষাদে রূপ দিতে না পারে, সেজন্য ঈদযাত্রার শুরুতেই শিশু ও অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং বায়ুবাহিত রোগ। ঈদের ছুটিতে যখন লাখ লাখ মানুষ বাস, ট্রেন বা লঞ্চে গাদাগাদি করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ করবেন, তখন এ ভাইরাসটি খুব দ্রুত ছড়াবে। আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সামান্য হাঁচি-কাশি থেকে আশপাশে থাকা সুস্থ ব্যক্তি বা শিশুরা সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। কেননা, হামের লক্ষণ বা শরীরে লালচে দানা (ফুসকুড়ি) দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকে এবং ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে তীব্রভাবে ভাইরাস ছড়ায়। ফলে, অনেক যাত্রী হয়তো নিজের অজান্তেই কেবল প্রাথমিক জ্বর নিয়ে ভ্রমণ করছেন এবং চারপাশের মানুষকে সংক্রমিত করছেন, যা ঈদের পর দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে টিকাহীন বা আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশু, পুষ্টিহীনতায় ভোগা শিশু এবং গর্ভবতী নারীরা এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।

গতকাল শনিবার রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের তিল ধারণের ফুসরত নেই; রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছেন সবাই। একদিকে কর্তব্যরতদের প্রচণ্ড ব্যস্ততা, অন্যদিকে দূরদূরান্ত থেকে অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে আসা বাবা-মায়ের পরিশ্রান্ত, মলিন ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চেহারা। চারপাশজুড়ে কেবলই আক্রান্ত শিশুদের কান্নার শব্দ।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেছে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে। সেখানে কোনো সিট ফাঁকা নেই; শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সিট না পেয়ে অনেক অসহায় বাবা-মাকে তাদের অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতেও দেখা গেছে। বুকভরা আশা নিয়ে এসেও সিট না পেয়ে সন্তানকে কোথায় নিয়ে যাবেন, কীভাবে চিকিৎসা করাবেন—তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা ছিল না এই দিশেহারা পরিবারগুলোর।

ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে : মার্চের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব। এরপর বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। একইসঙ্গে বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যাও। এরপর কিছুটা তুলনামূলক কমতে শুরু করে রোগীর সংখ্যা। আবার যারা আসেন, তারাও জরুরি চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফিরে যেতে পেরেছেন। তবে এখন আবার বাড়ছে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম বিভাগে দায়িত্বরতরা।

হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেছে কিনা জানতে চাইলে দায়িত্বরত নার্স বলেন, “আমাদের এখানে সারাক্ষণই রোগী আসতে থাকে। আমার দেখা অনুযায়ী বলতে পারি যে, আগের তুলনায় রোগী আসা কমেছে। তবে রোগী কমলেও খারাপ অবস্থার সংখ্যা বেড়েছে। আগে দেখা যেত, অনেক রোগী এসেছে, আমরা তাদের ইমার্জেন্সিতে দেখে বাসায় ট্রিটমেন্ট করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এখন যেটা হয়েছে, তা হলো—এডমিশন লাগেই।”

একদিনে আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু, মোট ৫১২ : ভয়াবহ হয়ে ওঠা হাম এবং এর উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট ৫১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২ হাজার ১৩২ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ সময়ে সারা দেশে আরও ১ হাজার ৯৬৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৩ জনের মধ্যে একজন শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। তার বাড়ি বরিশালে। বাকি ১২ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে।

উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে ঢাকায় চারজন, চট্টগ্রামে দুজন, সিলেটে চারজন, বরিশালে একজন এবং ময়মনসিংহে একজন শিশু রয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৮৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬২ হাজার ৫০৭ শিশুর। এ সময়ে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৯ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৫ হাজার ১১ জন শিশু।

হামের কারণে ডাক্তার-নার্সদের ঈদের ছুটি বাতিল : হামের রোগীদের চিকিৎসাসেবায় দায়িত্বরত ডাক্তার, নার্স ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

যেসব হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি আছে, সে হাসপাতালগুলোতে ঈদের ছুটির মধ্যে চিকিৎসকরা থাকবেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “হাম রোগীদের চিকিৎসাসেবায় দায়িত্বরত কোনো ডাক্তার ও নার্সের ঈদের ছুটি হবে না। তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকতে হবে। আমরা অলরেডি সার্কুলার দিয়েছি।”

টিকাতেও থামছে না শিশু মৃত্যু : দেশের এমন জরুরি পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নেয় সরকার। তবে মাঠপর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া সত্ত্বেও হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৫১২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে হামের উপসর্গে ১২ জন এবং নিশ্চিত হামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ১৩২ শিশু।

টিকা দেওয়ার পরও কেন মৃত্যুর হার কমছে না—এমন প্রশ্ন এখন সর্বত্র। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য ও টিকাদান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের একটি বড় অংশের শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। অপুষ্টির কারণে এ শিশুদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) সঠিকভাবে তৈরি হচ্ছে না। ফলে টিকা নেওয়ার পরও তারা হামের সংক্রমণ ও পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক : হামে আক্রান্ত সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে দিনের পর দিন কাটছে শত শত বাবা-মায়ের। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা আর নিয়মিত চিকিৎসা চলার পরেও অভিভাবকদের মন থেকে কাটছে না শঙ্কা ও আতঙ্ক। হাসপাতালে শয্যাশায়ী আদরের সন্তান কবে সম্পূর্ণ সুস্থ হবে এবং কখন তাকে নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন—উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে এখন সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন তারা।

সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা : ঈদের ছুটিতে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ফলে এ ছুটিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ঈদের ছুটিতে হামের সতর্কতা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, “ঈদের ছুটিতে বিশাল সংখ্যক মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হবে। এদের মধ্যে যাদের শরীরে হামের জীবাণু রয়েছে এবং যাদের জ্বর হওয়ার এক-দুদিন পার হয়েছে, তারা অন্যদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে। কারণ, হামের ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন আগে এবং চার দিন পর পর্যন্ত এটি জীবাণু বা ভাইরাস ছড়ায়। ফলে আমরা আশঙ্কা করছি, ঈদযাত্রার মধ্য দিয়ে হামের ভাইরাস আরও বেশি ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ঈদের পরে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “এ কারণে আমরা সবাইকে বলব, যাদের পরিবারের কোনো একজন অথবা একাধিক সদস্যের জ্বর থাকে, তাহলে তাদের উচিত কিছুটা অপেক্ষা করা; সেটি হামে রূপান্তরিত হয় কিনা, সেটি লক্ষ্য করা এবং একইসঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।”

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ঈদ   হাম   প্রকোপ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close