মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
মিয়ানমার সীমান্তে ঝরছে প্রাণ
কৌশিক দাশ, বান্দরবান
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ৯:১৩ এএম আপডেট: ২৫.০৫.২০২৬ ১১:৫৩ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। বিশেষ করে সীমান্তের শূন্যরেখা বরাবর মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে। আর এতেই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। মাইন বিস্ফোরণে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন; পঙ্গু হয়েছেন অনেকেই। এছাড়া সীমান্তের ওপর থেকে প্রায়শই গুলি, মর্টার শেল এসে বাংলাদেশ সীমান্তে পড়ছে। এতেও ঘটছে হতাহতের ঘটনা।

সর্বশেষ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তে তিনটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুরে এ ঘটনা ঘটেছে। বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছেন। সীমান্ত এলাকায় বাগানের কাজ করতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ঘুমধুম পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের পরিদর্শক জাফর ইকবাল জানিয়েছেন।

মাইন বিস্ফোরণে মারা যাওয়া তিনজন হলেন— অংক্যমং তঞ্চঙ্গ্যা (৪০), চিংক্ষ্যং তঞ্চঙ্গ্যা (৩২) ও চপোচিং তঞ্চঙ্গ্যা ওরফে লেরাইয়া (৩৫)। তাদের সবার বাড়ি নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভালুকিয়াপাড়ায়। বিস্ফোরণে মৃতদের কোমর থেকে শরীরের নিচের অংশ উড়ে গেছে।

ঘুমধুমের স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফলের বাগানে কাজ করার সময় তিনটি মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। হঠাৎ বিস্ফোরণে শুরুতে এক বাগানচাষি গুরুতর আহত হন। সঙ্গীরা দৌড়ে তাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার সময় আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেখানে আরেকজন গুরুতর আহত হন। আহত ওই দুজনকে উদ্ধার করতে যাওয়ার সময় আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনায় আরেকজন আহত হন। উপর্যুপরি তিনটি বিস্ফোরণের ঘটনায় কাজ করতে যাওয়া লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পাড়ায় এসে সংবাদ দেয়। পাড়াবাসী ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনকে মৃত অবস্থায় পেয়েছেন।

ঘুমধুম ইউনিয়নের সাবেক সদস্য বাবুল কান্তি চাকমা জানিয়েছেন, ভালুকিয়াপাড়াসহ সীমান্তের কাছাকাছি মানুষ সবাই শূন্যরেখা বজায় রেখে ফলের বাগানসহ বিভিন্ন চাষাবাদ করেন। এটি তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র উপায়। গত বছরও বাগানের কাজ করতে গিয়ে দুজন নিখোঁজ হয়েছেন। এখনো তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বনে সবজি খুঁজতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে একজন নারী দুই পা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আগের দুজনের নিখোঁজ, পা হারানো ঘটনাসহ আজকের তিনজনের মৃত্যুতে সীমান্তের মানুষ আতঙ্কে রয়েছে বলে বাবুল কান্তি জানিয়েছেন।

নাইক্ষ্যংছড়ির দফাদার সৈয়দ আলম ও ঘুমধুমের গ্রাম পুলিশ রূপম বড়ুয়া জানিয়েছেন, ঘটনা ৪১ সীমান্ত পিলার এলাকায় হলেও যেখানে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটি শূন্যরেখার ভেতরে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে এত শক্তিশালী স্থলমাইন কারা স্থাপন করেছে, তা তদন্ত হওয়া দরকার বলে মনে করেন দফাদার সৈয়দ আলম। মৃতরা সবাই বাগানচাষি।

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক জাফর ইকবাল মাইন বিস্ফোরণে তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, লাশ তিনটি উদ্ধার করে রেজুপাড়া বিজিবির সীমান্ত চৌকিতে আনা হয়েছে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে থানায় হস্তান্তর করা হবে।

এর আগে ১৫ এপ্রিল কক্সবাজারের উখিয়ায় নাফ নদীর শূন্যরেখায় মাইন বিস্ফোরণে এক রোহিঙ্গা যুবকের ডান পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আহত যুবকের নাম মো. ইউনুছ (২৫)। তিনি উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১৯) ডি-২ ব্লকের সবুল আহমদের ছেলে। বিজিবি ও স্থানীয় জেলেদের সূত্রে জানা গেছে, ইউনুছ এলাকাটিতে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন। আহত অবস্থায় স্থানীয় জেলেরা তাকে উদ্ধার করে উখিয়ার এমএসএফ হাসপাতালে পাঠান। পরে সেখান থেকে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণ ঠেকাতে দুই বছর ধরে নাফ নদীতে জেগে ওঠা চরসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় শত শত স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। কয়েক মাস ধরে স্থলমাইন বিস্ফোরণে লোকজন বেশি আহত হচ্ছেন, এর বেশিরভাগই রোহিঙ্গা।

এর আগে ১০ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উখিয়ার বালুখালী সীমান্তসংলগ্ন নাফ নদীর শূন্যরেখার নারিকেলবাগান এলাকায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে মো. সাদেক নামের এক রোহিঙ্গা আহত হন। ২৯ মার্চ দুপুরে উখিয়া সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল হাকিম (১৫) নামের এক কিশোরের ডান পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এর কয়েক দিন আগে একই উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্তে নাফ নদীর শূন্যরেখায় স্থলমাইন বিস্ফোরণে শহীদুল ইসলাম (২৫) নামের আরেক রোহিঙ্গা যুবক গুরুতর আহত হন। তারও একটি পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়।

এর আগে গত ৭ মার্চ বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল জব্বার (৫৩) নামের এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে তার বাঁ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নিচের অংশটি উড়ে গেছে। আহত আবদুল জব্বার উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নের পাইনছড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি পেশায় কাঠুরিয়া। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দোছড়ি ইউনিয়নের পাইনছড়া গ্রামটি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। গতকাল এ এলাকার সাত থেকে আটজন কাঠুরিয়া বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঠ কাটতে গিয়েছিলেন। এ সময় শূন্যরেখার কাছে একটি মাইন বিস্ফোরণে আবদুল জব্বার আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাঁ পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে যায়।

২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে অন্তত ৬৩ জন মাইন বিস্ফোরণে হতাহত হয়েছেন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের, পা হারিয়েছেন ৪৮ জন। বাকিদেরও বিভিন্ন অঙ্গহানি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ ও ২০২৪ সালে। ২০২৪ সালে ১০ জন এবং গত বছর ১৮ জন হতাহত হয়েছেন।

মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে শিশু নিহত : গত ১১ জানুয়ারি সকালে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয় হুজাইফা সুলতানা আফনান নামের এক শিশু। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৭ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয়।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  মিয়ানমার   সীমান্ত   প্রাণ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close