মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
টার্গেট করে চাঁদাবাজি
রোকন উদ্দিন
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ৯:২৩ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরবানির পশুর হাটকে ঘিরে নতুন চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে। বদলে গেছে চাঁদা আদায়ের ধরনও। আগে ট্রাকপ্রতি চাঁদা নেওয়া হলেও এখন আদায় করা হচ্ছে গরুপ্রতি। প্রতিটি গরুর খুঁটি বা ঢাকায় প্রবেশের জন্য অতিরিক্ত চাঁদা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এবার পশুর হাট ঘিরে প্রায় ১৯৫ কোটি টাকা চাঁদা সিন্ডিকেট সদস্যদের পকেটে যেতে পারে।

এদিকে দেশের পাঁচ জেলার কুরবানির পশুর হাটে ইজারাদারের কর্মীরা হাসিলের নামে চাঁদা তুলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সরকারিভাবে হাসিল ঠিক করে দেওয়া হলেও মানছে না কেউ। হাসিল আর খুঁটি কেনা বাবদ গরুপ্রতি অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। সেখান থেকেই একদিনে তুলে নেওয়া হচ্ছে আনুমানিক শত কোটি টাকা। এছাড়া রাস্তায় পশুর ট্রাক থেকে নানা অজুহাতে টাকা তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ আর বগুড়া থেকে একটি পশুর ট্রাকের ঢাকায় আসার অনিয়ম উঠে এসেছে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুসন্ধানে।

বিশ্লেষকদের মতে, কুরবানির পশুর হাটকে ঘিরে রাজনীতিবিদ, প্রশাসন ও ক্যাডারদের সমন্বয়ে একটি চাঁদার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাদের দাবি, শুধু ওপরের স্তর থেকে শুরু না করলে চাঁদাবাজি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।

খামারিদের অভিযোগ, কুরবানির পশুর হাটে এবার অতিরিক্ত খরচ ও নানা হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। একেকটি গরুর খুঁটির জন্য ১৫০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে বলে জানান তারা, যেখানে একটি খুঁটিতে মাত্র একটি গরুই বাঁধা যায়। প্রায় ২০ বছর ধরে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় গরু নিয়ে আসা এক খামারি বলেন, ‘এত বছরেও এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।’

এদিকে, উত্তরা গরুর হাটেও পরিস্থিতি একই রকম বলে অভিযোগ খামারিদের। হাটে প্রবেশের সময় কোনো সমস্যা না হলেও ভেতরে গিয়ে গরুপ্রতি ১৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে জানান তারা। এক খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি গরুতে যদি ১৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়, তাহলে ৩০টা গরুর ক্ষেত্রে কত টাকা দাঁড়ায়? আমরা যে সামান্য লাভ করি, সেটাও এভাবে নিয়ে যাচ্ছে।’

কুরবানির পশুর হাটগুলোতে চাঁদাবাজির অভিযোগ ঘিরে খামারিদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থানে চাঁদার হিসাব নিয়ে খামারিদের সঙ্গে হাট কর্তৃপক্ষেরও বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। আগে থেকেই ঘোষণা দেওয়া আছে, গরু বিক্রি হলেই চাঁদার টাকা পরিশোধ করতে হবে।

একদিনেই শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি : পাঁচ জেলার কুরবানির পশুর হাটে হাসিলের নামে চাঁদা তুলছেন ইজারাদারের কর্মীরা। সরকারিভাবে হাসিল ঠিক করে দেওয়া হলেও মানছে না কেউ। হাসিল আর খুঁটি কেনা বাবদ গরুপ্রতি অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। সেখান থেকেই একদিনে তুলে নেওয়া হচ্ছে আনুমানিক শত কোটি টাকা। এছাড়া রাস্তায় পশুর ট্রাক থেকে নানা অজুহাতে টাকা তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ আর বগুড়া থেকে একটি পশুর ট্রাকের ঢাকায় আসার অনিয়ম উঠে এসেছে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের অনুসন্ধানে।

সিরাজগঞ্জের কান্দাপাড়া পশুর হাটে আশপাশের উপজেলা, ইউনিয়ন থেকে পশু নিয়ে আসেন খামারি, রাখাল আর গৃহস্থরা। সেখানে খুঁটিতে গরু বাঁধতে গেলেও গরুপ্রতি দিতে হয় ৪০০ টাকা, যার কোনো নিয়ম নেই। তেমনি হাসিলের নামেও নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। এরই মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ৫০০ টাকার জায়গায় ইজারাদার আদায় করছেন ৭০০ টাকা।

হাটটির ইজারাদার বোরহান জানান, টাকা বেশি নিলেও রিসিটে (রশিদ) লিখছেন না। তাই ধরা পড়ার সম্ভাবনা নেই। আর এগুলো ঈদের বকশিশ (সালামি)। এ ছাড়া এ অতিরিক্ত টাকা না নিলে চালান (মূলধন) উঠবে না বলেও দাবি তার।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান বলেন, উপজেলা প্রশাসন এমন কোনো অভিযোগ কারও থেকে পায়নি।

এদিকে, সিরাজগঞ্জের ২২টি হাটে হাটবারে গড়ে ৪০ হাজারের মতো গরু বিক্রি হয়। সে হিসেবে জেলার সবগুলো হাট থেকে অতিরিক্ত ৩৫ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে।

আবার পাবনা জেলায় রয়েছে ২০টি হাট। সেখানেও সরকারি রেটে নেওয়া হচ্ছে না হাসিল। একদিনের হাট থেকে তোলা হয় অতিরিক্ত প্রায় ২৫ কোটি টাকা। ১৬টি হাট রয়েছে কুষ্টিয়ায়। গড়ে ৫০০ টাকা করে বেশি তোলা হচ্ছে রশিদ ছাড়াই। সেই হিসেবে এই জেলার হাটগুলো থেকে মিলছে না প্রায় ২৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া বগুড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৯০টি হাট। সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী মহাস্থান। শুধু এই হাট থেকেই পশুপ্রতি অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকা। বাকি হাটগুলো মিলিয়ে শুধু বগুড়ায় তোলা হয় অতিরিক্ত ১৮ কোটি ৩০ লাখ টাকার মতো।

অন্যদিকে, চুয়াডাঙ্গার সবচেয়ে বড় পশুর হাট আলমডাঙ্গা পৌর পশুর হাট। যেখানে হিসাব রাখার নামে চাঁদাবাজি শুরু হয় হাটে ঢুকতেই। আবার হাটে গরু নামানোর জন্য মাটি দিয়ে উঁচু করা জায়গার দাম নেওয়া হয় ১ হাজার টাকা। এছাড়া এ জেলায় আছে আরও ৪টি হাট, যেখানে দৈনিক বিক্রি হয় ২০ হাজারের বেশি কুরবানির পশু। সেখানে বিভিন্ন উপায়ে রাখা হয় অতিরিক্ত টাকা।

টিভি চ্যানেলটির প্রতিবেদক পশুবাহী ট্রাকে করে আলমডাঙ্গা থেকে একজন ব্যাপারী মোহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঢাকার দিয়াবাড়ি হাটের উদ্দেশে যাত্রা করে। কিন্তু ওই হাটেই তাকে দিতে হয়েছে অতিরিক্ত ২৪ হাজার টাকা। পথে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে ট্রাক দাঁড় করিয়ে টাকা নেয় পুলিশ। সেখানে সাংবাদিক উপস্থিত থাকায় সেই টাকা আবার চালককে ফেরত দেয় তারা।

এদিকে, এমন সংবাদ প্রচারের পর হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার এসআই তোফাজ্জল হোসেনসহ ৫ কনস্টেবলকে বগুড়া হাইওয়ে রেঞ্জ থেকে ক্লোজ করা হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা আগেই জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

ডিএমপির ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় কাউকে চাঁদাবাজি করার জন্য রাস্তায় দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। কেউ যেন কুরবানির গরু নিয়ে কোনো ঝামেলায় না পড়ে, সে জন্য পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে।’

এদিকে পশুর হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়, জাল টাকার কারবারিদের দৌরাত্ম্য, হাইওয়ে ও হাটে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন টাঙ্গাইল জেলার হাজার হাজার খামারি ও সাধারণ ক্রেতা। তাদের দাবি, যমুনাসেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধ করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন— দেশীয় খামারিদের রক্ষা, ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাবনাময় এ খাতকে বাঁচাতে অন্তত ছয়টি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন, চিকিৎসা ক্যাম্প ও ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন, চোরাচালান রোধে কঠোর নজরদারি, হাসিল বা টোল আদায়ে সতর্কতা, জাল টাকা রোধে ব্যাংকের বুথ স্থাপন এবং হাইওয়ে ও পশুর হাটে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের চাঁদাবাজদের পাশাপাশি যারা তাদের সহায়তা করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।’

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চাঁদাবাজি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close