পবিত্র ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ত হয়ে উঠছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কামারপট্টিগুলো। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এখন যেন দম ফেলারও ফুসরত নেই কামার শিল্পীদের। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের তাপে ঘাম ঝরিয়ে তারা তৈরি করছেন কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার প্রয়োজনীয় দা, বটি, ছুরি, চাকু ও চাপাতি। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে মুখর হয়ে উঠেছে শহর ও গ্রামের কামারপাড়াগুলো। চারদিকে শুধু হাতুড়ি পেটানোর টুং-টাং শব্দ, হাপরের ফোঁস-ফাঁস আর জ্বলন্ত কয়লার আগুনের লেলিহান শিখা।
সোমবার (২৫ মে) বিকালে সরেজমিনে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পুরান থানা, বড় বাজার, আখরা বাজার, টিনপট্রি, মোরগ মহলসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, প্রতিটি কামারের দোকানে চলছে কর্মব্যস্ততার চরম দৃশ্য। কোথাও আগুনরঙা লোহা ভারি হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছেন কারিগররা, কোথাও আবার কেউ হাপর টেনে আগুন জ্বালিয়ে রাখছেন। কেউ পুরনো ছুরি ও চাপাতিতে শান দিচ্ছেন, আবার কেউ নতুন সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত। পুরো এলাকা যেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়েছে।
কামার শিল্পীরা জানান, কোরবানির ঈদ তাদের বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। বছরের বাকি ১১ মাস কোনোমতে সংসার চালালেও এই সময়ের আয় দিয়েই মূলত সারা বছরের ব্যবসা টিকিয়ে রাখেন তারা। তাই ঈদ সামনে রেখে প্রতিটি দোকানে বেড়েছে শ্রমিকের সংখ্যা। আগে যেখানে দুইজন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে ৫-৬ জন পর্যন্ত শ্রমিক কাজ করছেন।
জেলা শহরের বিভিন্ন কামারপট্টিতে দেখা যায়, দোকানের সামনে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের দা, চাপাতি, ছুরি ও বটি। অনেকেই অগ্রিম অর্ডার দিয়ে তৈরি করাচ্ছেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। আবার কেউ পুরনো জিনিসে নতুন করে শান দিচ্ছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করতে গিয়ে ক্লান্তিতে নুয়ে পড়লেও থেমে নেই কামারদের হাত।
কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য ব্যবহৃত এসব সরঞ্জামের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারেও বসেছে অস্থায়ী দা-বটি ও ছুরির দোকান। প্রতিদিন শতশত মানুষ এসব দোকানে ভিড় করছেন প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে কিংবা পুরনো অস্ত্র শান দিতে।
তবে ঈদ মৌসুমে দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকের অভিযোগ, বছরের এই সময়টায় দা, ছুরি ও চাপাতির দাম বাড়িয়ে নেওয়া হয়। ছুরি শান দিতেও ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এদিকে কামার শিল্পীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ার কারণেই তাদের পণ্যের দাম কিছুটা বেশি রাখতে হচ্ছে।
জেলা শহরের পুরান থানা এলাকার কামারের দোকানে আসা আলাল হোসের বলেন, “আমরা পারিবারিকভাবে সবাই মিলে কোরবানি করি। গরুর মাংস নিজেরাই কাটাকাটি করি। তাই কোরবানির জন্য কিছু চাপাতি, দা ও চাকু শান দিতে এবং কয়েকটি নতুন কিনতে এসেছি। তবে এই সময়টায় চাহিদা বেশি থাকায় দামও একটু বেশি।”
বড় বাজারের কামার শিল্পী মোবারক হোসেন বলেন, “পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছুরি ২৩০-২৫০ টাকা, দা ৩০০-৩৫০ টাকা, বটি ৪০০-৫০০ টাকা, পশু জবাইয়ের ছুরি ৮০০-১০০০ টাকা এবং চাপাতি ৬০০-৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রচুর কাজের চাপ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেও শেষ করা যাচ্ছে না। আগে যেসব দোকানে দুইজন শ্রমিক কাজ করতো, এখন সেখানে ৫-৬ জন শ্রমিক কাজ করছে। লোকজনের চাপও অনেক বেড়েছে।”
মোরগ মহল এলাকার কামার শিল্পী খাইরুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বছর ঈদ সামনে রেখে আমরা বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করি। কিন্তু বর্তমানে লোহা, কয়লা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম অনেক বেড়ে গেছে। শ্রমিকদের মজুরিও বেশি দিতে হচ্ছে। সে তুলনায় পণ্যের দাম খুব বেশি বাড়ানো হয়নি।”
তিনি জানান, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প এখন হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক তরুণ এই পেশায় আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন খাইরুল ইসলাম।
কেকে/এমএ