কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার ঘিরে মহল বিশেষের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কারাভ্যন্তরে অবৈধ সুবিধা না পেয়ে কর্তৃপক্ষের বিপক্ষে অবস্থান নেন ৬ বার কারাভোগ করা বিতর্কিত ব্যক্তি। অন্যদের প্ররোচনায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ চতুর্থ আদালতে রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলার আলোচিত আসামি ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন। এ নিয়ে মিশ্রু প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি কিশোরগঞ্জে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে দলীয় শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্ত পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইমতিয়াজ আহমেদ কাজলকে গণঅধিকার পরিষদ শুক্রবার রাতে দলীয় সকল পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
সূত্র জানায়, ২৫-০৫-২০২৬ কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১ থেকে জামিনে মুক্ত হন মাদক মামলার আলোচিত ও বিতর্কিত আসামি ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল। ২০-০৪-২০২৬ থেকে দীর্ঘ ১ মাস ৬ দিন তিনি কারাগারে আটক ছিলেন। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি কারা কর্তৃপক্ষকে টার্গেট করে অপপ্রচারে নামেন। মনগড়া ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন। কিশোরগঞ্জ আদালতে কাজলের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও মারামারিসহ ৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। এবার নিয়ে তিনি ৬ বার দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেন।
জানা যায়, মাদক মামলার রায় ঘোষণার ধার্য তারিখ গত ২০ মে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালত আসামি ইমতিয়াজ আহমেদ কাজলের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিজ্ঞ বিচারক বিব্রত বোধ করায় এদিন মামলাটি ছেড়ে দেন। রায় ঘোষণার জন্য মামলাটি চতুর্থ আদালতে প্রেরণ করা হয়। সূত্রমতে, মামলায় রায় ঘোষণার দুই দিন আগে ১৮ মে ন্যায়বিচার চেয়ে আসামি কাজল বিজ্ঞ বিচারকের হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠান। ওই মেসেজে লেখা, স্ক্রিনশট ও ভিডিও পাঠানো হয়। এ ঘটনায় বিব্রত হয়ে বিজ্ঞ বিচারক কাজলকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
সূত্র জানায়, কারাগারে যাওয়ার পরের দিন থেকে কাজল কারা কর্তৃপক্ষ ও স্টাফদের কাছে থাকার ভালো জায়গা এবং খাবার দাবি করেন। পিসিতে টাকা না থাকার পরও ক্যান্টিন থেকে বাকিতে পণ্য চান। গণঅধিকার পরিষদের নেতা পরিচয়ে কর্তৃপক্ষকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। ইচ্ছামতো কারাগারে চলাফেরা করতে চাইলে স্টাফরা বাধা দিলে তিনি চটে যান। তাকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়— জেল কোড অনুযায়ী অন্য বন্দিদের মতো থাকতে হবে। অবৈধ সুবিধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জামিনে মুক্তি পাওয়ার দুই দিন পর ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল অন্যদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন।
কিশোরগঞ্জ কারাগারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে আইজি প্রিজন্স শনিবার দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, কারাগারে অনিয়ম ও দুর্নীতি পুরোনো কথা। এখন আর তা সম্ভব নয়। অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তবুও কোথাও অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। অনৈতিক কর্মকাণ্ড রোধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। তিনি বলেন, অভিযোগকারীকে আরও সতর্ক হতে হবে। দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে কারা অধিদপ্তরকে সহযোগিতা করতে হবে।
জানা যায়, ভৈরব উপজেলা সদরের মধ্যপাড়ার মৃত আলী হোসেনের ছেলে ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। পুলিশ নিউ টাউন থেকে ১০২ পিস ইয়াবাসহ কাজলকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ৯(খ) ধারায় থানায় মামলা নম্বর: ০৪(১০)২০১৬ দায়ের হয়। পুলিশ পরের দিন তাকে কিশোরগঞ্জ আদালতে প্রেরণ করে। দীর্ঘ তিন মাস কারাবাসের পর হাইকোর্টের জামিনে তিনি মুক্তি পান। আগামী ০৯-০৭-২০২৬ মামলাটি রায়ের জন্য ধার্য রয়েছে। দায়রা নম্বর: ২২/১৭ ও জিআর নম্বর: ৭৫২(২)১৬।
সূত্র জানায়, ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল ২০১৪ সাল থেকেই মাদকাসক্ত। ভৈরব ও আশপাশ এলাকার মানুষ তাকে ‘বি ক্লাস’ কাজল হিসেবে চেনেন। সব ধরনের নেশায় আসক্ত কাজল ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার হন। দীর্ঘ তিন মাস পর জামিনে ছাড়া পেয়ে পুরোনো কায়দায় প্রকাশ্যে মাদক সেবন শুরু করেন। মদদ দেন ঘনিষ্ঠ মাদক ব্যবসায়ীকে। ২০১৫ সালে ভাঙচুর ও মারামারির মামলায় ১ মাস ৪ দিন কারাভোগ করেন। ২০১৭ সালে ৩০২ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। এ মামলায় দীর্ঘ ৬ মাস কারাগারে আটক ছিলেন। চলন্ত বাসে ঢিল ছুড়ে যাত্রী হত্যার মামলায় ২০১৭ সালে কারাভোগ করেন।
জানা যায়, কাজল ২০১৮ সালে ২টি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিন মাসের অধিক কারাগারে আটক ছিলেন। ২০২১ সালে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর মামলায় ৫ দিন কারাভোগ করেন। সবশেষে তারই দল গণঅধিকার পরিষদের নেতা শামসুল হক মামুন এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কাজলের বিরুদ্ধে ভৈরব থানায় ভাঙচুর ও মারামারির মামলা দায়ের করেন। সূত্রমতে, কাজলের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জ আদালতে হত্যা, মাদক, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও মারামারির ৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কাজল এর আগে এক শ্রেণির কারা কর্মকর্তা ও স্টাফদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নিতে পারলেও এবার প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। এর পরই অন্যদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে মাতেন।
সূত্র জানায়, বিভিন্ন মামলা থেকে রক্ষা পেতে ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল ২০২২ সালে গণঅধিকার পরিষদে যোগ দেন। সংগঠনের নামে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে শুরু করেন চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ। প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন মানুষকে প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকি দেন। তার জ্বালায় অতিষ্ঠ ভৈরবসহ আশপাশ এলাকার মানুষ। এত দাপটের পরও কাজলকে গত ২০ মে ষষ্ঠবারের মতো কারাগারে যেতে হয়। সূত্রমতে, ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল দলীয় প্রধান নুরুল হক নুরুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করতেও দ্বিধা করেন না। এ অভিযোগ খোদ গণঅধিকার পরিষদ নেতাদের।
জানা যায়, অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালোই চলছে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১। সাড়ে ২১ মাসে ফিরেছে স্বচ্ছতা। কারা অধিদপ্তরের নতুন মেনু অনুযায়ী বন্দিরা প্রতিদিনই ভালো মানের খাবার পাচ্ছেন। জেল কোড অনুযায়ী সব ধরনের সুবিধা পেয়ে বন্দিরা খুবই খুশি। বৃহস্পতিবার কোরবানি ঈদের দিন আনন্দ-উৎসবে মেতেছিলেন ১ হাজার ৩১২ বন্দি। এর মধ্যে ১ হাজার ২৫৭ জন পুরুষ ও ৫৫ জন নারী। তাদের মধ্যে ১৭ জন নারীসহ ২৩৫ জন কয়েদি ছিলেন। তিন বেলা ব্যবস্থা করা হয়েছিল উন্নত খাবার। আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন খেলাধুলা। ফুল দিয়ে বরণ করে আপ্যায়ন করা হয়েছিল দর্শনার্থীদের। দুপুরে স্টাফদের জন্য ব্যবস্থা করা হয় উন্নত খাবার।
অন্যদিকে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন এনডিসি, পিএসসির কঠোর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১-এর জেল সুপার মো. দিদারুল আলম ও জেলার ফারহানা আক্তার। তাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং করেন ঢাকা বিভাগ-২ এর ডিআইজি প্রিজন্স টিপু সুলতান। এরই মধ্যে গত সাড়ে ২১ মাসে আমূল পরিবর্তন হয়েছে দেশের ৭৩টি চালু কারাগারের। সবকিছু সম্ভব হয়েছে আইজি প্রিজন্সের কর্মদক্ষতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও কঠোরতার জন্য। তিনি ঢেলে সাজিয়েছেন কারাগারগুলো। এর সুফল ভোগ করছেন বন্দি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। বন্দিরা এখন কম টাকায় কারা ক্যান্টিন থেকে বিভিন্ন খাবার ও পণ্য কিনতে পারছেন।
সূত্র জানায়, কিশোরগঞ্জ কারাগারে আটা ও জুতা তৈরির কারখানা রয়েছে। নারীদের জন্য রয়েছে নকশিকাঁথা ও সেলাই শিক্ষার ব্যবস্থা। কারাগারে বিভিন্ন ধরনের কাজ শিখে বন্দিরা বাড়ি ফিরে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। রয়েছে কোরআনসহ ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা। বিশাল কারাগারের ফাঁকা জায়গায় সবজি চাষ করে বাড়ানো হয়েছে রাজস্ব আয়। উৎপাদিত সবজি বিক্রি হচ্ছে বন্দিদের জন্য। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ডেইরি ফার্ম থেকে উৎপাদিত দুধ সুলভ মূল্যে বন্দি, কর্মকর্তা ও স্টাফদের কাছে বিক্রি হয়। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি রয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১ এ। স্টাফসংখ্যা অপ্রতুল। ২৮ একর জমির এ কারাগার নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খান জেল সুপার ও জেলার। ১৬ একর জমিতে মূল কারাগার।
কেকে/এলএ