মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
হামের পর চ্যালেঞ্জ ডেঙ্গুতেও
শরীফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৯:১৪ এএম আপডেট: ০২.০৬.২০২৬ ১০:১৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার লড়াইয়ের মধ্যেই এবার দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের সামনে নতুন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু। জোড়া ভাইরাসের এ দ্বিমুখী আক্রমণে রাজধানীসহ সারা দেশে নতুন করে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। হাসপাতালগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে রোগীর চাপ, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জোড়া ভাইরাসের এ দ্বিমুখী প্রকোপ মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে, চলতি বছরে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এক ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই এডিস মশার তীব্র ঘনত্ব স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় বিপদের সংকেত দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন এবং যথাসময়ে কার্যকর মশক নিধন অভিযান না হওয়ায় এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে বর্ষা পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বর্তমানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে শুধু দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এডিস মশার বিস্তার এখন ঢাকা ছাড়িয়ে জেলা শহর, পৌরসভা এবং গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য মশা নিধনে বড় বরাদ্দের আলোচনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ অর্থ কতটা পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূভাবে ব্যয় হচ্ছে? শুধু কীটনাশক ক্রয় ও স্প্রে কার্যক্রমে অধিকাংশ অর্থ ব্যয় করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।

ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে ১১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত এক দিনে ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটির হাসপাতালে একজন এবং দক্ষিণ সিটির হাসপাতালে ১২ জন ভর্তি হয়েছেন। এ দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগে ১৫ জন, বরিশাল বিভাগে ৩৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২ জন, খুলনা বিভাগে ২১ জন, ময়মনসিংহে আটজন, রাজশাহীতে পাঁচজন এবং সিলেটে একজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত এক দিনে মারা যাওয়া ব্যক্তি খুলনা বিভাগের একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় বছর বয়সী এক শিশুর হামের পরই ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। শিশুটিকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। শিশুটি এ হাসপাতালে মৌসুমের প্রথম ডেঙ্গু রোগী। শিশুটির নাম তাইবা। বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা চৌধুরীপাড়া গ্রামে। হামের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর গত শুক্রবার রাতে তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গতকাল রোববার রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে, শিশুটি ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে।

গত বছর ডেঙ্গুর দাপট দেখা গেলেও চলতি বছরের এ পর্যন্ত মশাবাহিত এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা কম। গত মার্চ ও এপ্রিলে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। তার আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে এবং মে মাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে নভেম্বর মাসে। সেই মাসে ১০৪ জনের প্রাণ যায়।

চলতি বছরে এ যাবৎ মোট তিন হাজার ১৩৮ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরের ১ জুন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন তিন হাজার ৩০৭ জন। এর মধ্যে ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়।

২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মোট তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুত সরকার : ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ডেঙ্গু মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এখনো প্রতিদিন দু-একজন করে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। যেহেতু এ সময়ে ডেঙ্গু দেখা দেয়, এজন্য কালক্ষেপণ না করে তা মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা।

তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার করা হচ্ছে। আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত আছে। প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আরও ফিল্ড হাসপাতাল করা হবে।

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চিকিৎসা পরিকল্পনাসহ বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেবে সোসাইটি অব মেডিসিন। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থাও সহায়তা করছে। কাল থেকেই কাজ শুরু হচ্ছে। সারা দেশে ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগে এবং জেলাগুলোতে চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। রিএজেন্ট, টেস্টিং কিটস এবং ফ্লুইড স্যালাইনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকরণ কিছু সংগ্রহে আছে। চাহিদা অনুযায়ী আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

ডেঙ্গুর মূল উৎপত্তি নিয়ে পদক্ষেপ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে দুই মাস আগে থেকেই কাজ শুরু করেছি। সভায় ডেঙ্গুবিষয়ক একটি অ্যাপ চালু করার ব্যাপারে আলোচনা করা হয় এবং ডেঙ্গুবিষয়ক গবেষণা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গত বছর (২০২৫ সালে) যেখানে ৪১৩ জনের মৃত্যু এবং লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, এবার মৌসুমের শুরুতেই সেই গ্রাফ আরও ঊর্ধ্বমুখী। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে দ্রুত প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং শক সিনড্রোমে চলে যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ার কারণ : মৌসুমের শুরুতেই দফায় দফায় বৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব গত বছরের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ে মশক নিধনে কার্যকর ও আধুনিক ওষুধের ঘাটতি এবং জনসচেতনতার অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু রাসায়নিকনির্ভর কার্যক্রম নয়; এটি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, নজরদারি, প্রযুক্তি ব্যবহার, নাগরিক সচেতনতা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রক্রিয়া।

সিটি করপোরেশনগুলোতে ওয়ার্ডভিত্তিক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ কর্মসূচি, পৌরসভায় নিয়মিত লার্ভা সার্ভে ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জনসচেতনতা ও পানি জমার উৎস ধ্বংসে আলাদা বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রতিটি জেলায় ‘ভেক্টর সার্ভেইলেন্স ইউনিট’ গঠন করে প্রশিক্ষিত কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে নিয়মিত মশার ঘনত্ব, প্রজাতি এবং কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, দেশে এখনো তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বড় ঘাটতি রয়েছে। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা বেশি, কোথায় কীটনাশক কার্যকর নয়, অথবা কোন সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে— এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

ফ্লাডেড ফ্লোর বা বেজমেন্ট এলাকাগুলো ঢাকার দ্রুত নগরায়নের কারণে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বহু ভবনের নিচতলায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। অথচ এ স্থানগুলো নিয়মিত নজরদারির বাইরে থেকে যায় বলে মনে করেন এ-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চ্যালেঞ্জ   ডেঙ্গু  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close