২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও প্রকাশ্যে শোডাউন নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা নানা কৌশলে পুনরায় রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খণ্ড খণ্ড মিছিল, ঝটিকা সমাবেশ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাছাড়া কোনো কোনো জায়গায় হামলা-ভাঙচুরও করছেন তারা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতির মধ্যেও দলটির তৃণমূল ও সমর্থক গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
দলটির কর্মী ও সমর্থকরা মনে করছেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় রাজপথে এ আন্দোলন তাদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার এবং মাঠপর্যায়ের শক্তি প্রমাণের সুযোগ করে দিচ্ছে। তারা বলেন, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতার অনুপস্থিতি ও পলাতক থাকার বিষয়টি দলের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে বড় একটি সাংগঠনিক শূন্যতা ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তৃণমূলের সক্রিয় কর্মীরা নানা ঝটিকা কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে এটি কতটুকু স্থায়ী ভিত্তি পাবে, তা নির্ভর করবে তাদের নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাসের ওপর।
বিএনপি কার্যালয়সহ বাড়িঘরে হামলা
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় আধিপত্য ও পূর্ববিরোধের জেরে ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়সহ স্থানীয় নেতাকর্মীদের অন্তত ১০টি বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সোমবার উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের চর-বলাকি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, হোসেন্দী ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক নেতা ও একাধিক মামলার আসামি নাজমুলের সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাহফুজ প্রধানের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। পুলিশ সুপার মো. মিনহাজুল আলম বলেন, স্থানীয় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে।
দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সামনে মৌন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। গতকাল সকালে ডাকসু ভবনের সামনে মানববন্ধন শেষে ছয় দফা দাবি-সংবলিত একটি লিখিত বক্তব্য প্রচার করা হয়। লিখিত বক্তব্যে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে তার ফাঁসির দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির দাবি, প্রধান উপদেষ্টা ‘হামের টিকার অর্থ আত্মসাৎ’ করেছেন এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। মিছিলের একাধিক ভিডিও সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, সকালে সংগঠনের ওমরগণি এমইএস কলেজ শাখার নেতাকর্মীরা মিছিলটি করেছেন। এছাড়া সকাল আটটার দিকে আনোয়ারা উপজেলার পিএবি সড়কের চাতরী চৌমুহনী এলাকাতেও মিছিল করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
শনিবার চট্টগ্রামের বাঁশখালীতেও ঝটিকা মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী মনির উদ্দিনের নেতৃত্বে এ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
গত রোববার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের নিমসার এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে, গতকাল ভোরে শরীয়তপুরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাইজুল ইসলাম সরকারের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল করেছে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী।
সিরাজগঞ্জের চৌহালীতেও ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীর ঝটিকা মিছিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রলীগ কর্মী এস. এন. সাব্বিরকে রোববার বিএনপির নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় আটক করে পুলিশ। এছাড়াও সন্ধ্যার দিকে ছাত্রলীগ কর্মী মুত্তাকিন হোসেন (২১)-কে আটক করা হয়।
এদিকে সোমবার মৌলভীবাজারে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেছেন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল নারায়ণগঞ্জে যুবলীগের ঝটিকা মিছিলে ধাওয়া দিয়েছে এনসিপির নেতাকর্মীরা। এনসিপির মহানগর কমিটির আহ্বায়ক শওকত আলী বলেন, সকালে ১৫-২০ জনের একটি দল নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে মিছিল বের করে। পেছনে একটি ইজিবাইকে মহানগর এনসিপির চার সদস্য মিছিলটি দেখতে পেয়ে ধাওয়া করেন। সঙ্গে সঙ্গেই মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে ব্যানার দেখে বুঝতে পারি, তারা প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের অনুসারী এবং যুবলীগ কর্মী।
এদিকে পটুয়াখালীর বাউফলে তালাবদ্ধ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, শনিবার রাতে পৌর শহরের কুন্ডুপট্টি সড়কে অবস্থিত আওয়ামী লীগের (জুয়েল গ্রুপ-সমর্থিত) কার্যালয়ের সামনে এই পতাকা তোলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজপথে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের এসব কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগের সদস্যপদধারী এক নেতা বলেন, ‘‘আমাদের দলের সভানেত্রী (শেখ হাসিনা) বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতেও আগ্রহী। তার এমন বক্তব্যে সব নেতাকর্মীর মনোবল চাঙ্গা হয়েছে। তারা এখন রাজপথে সক্রিয় হতে মানসিক শক্তি পাচ্ছেন।’’
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দলীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইতোমধ্যে তিনি ভারত সরকারের সঙ্গে তার প্রয়োজনীয় আলোচনা শেষ করেছেন এবং বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে নিজের ইচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ সম্পর্কে দিল্লিকে অবহিত করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৫ আগস্টের আগেই তিনি দিল্লির কাছে ‘ট্রাভেল পাস’ বা ভ্রমণ অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা এবং শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে আসার বিষয়ে শেখ হাসিনা এখন অনেকটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি তার মনোভাবের কথা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। দলীয় প্রধানের পক্ষ থেকে তৃণমূলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার জন্য বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।
ইউরোপ ও ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ হাসিনা মনে করছেন, দলের এই ক্রান্তিকালে নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো তার প্রধান দায়িত্ব। তিনি নেতাকর্মীদের সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তৃণমূলের প্রতি দেওয়া বার্তায় বলা হয়েছে, ‘এবারের সংগ্রাম শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম।’ এই লক্ষ্য নিয়ে নেতাকর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
দলের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নেত্রী দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। তিনি যেভাবে ভারতে গিয়েছিলেন, সেভাবেই বীরদর্পে জনগণের মধ্যে ফিরে আসবেন। তার ফিরে আসা উপলক্ষে বিপুল জনসমাগম করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
এ বিষয়ে পলাতক থাকা দলটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমে বলেছেন, আওয়ামী লীগ জনগণের দল। কোনো আইন করে আওয়ামী লীগকে দমিয়ে রাখা যাবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি বড় কর্মসূচির বদলে ‘উপস্থিতি জানানোর’ কৌশল নিয়েছে। প্রথমে তারা এলাকায় অবস্থান নেবে। তারপর ছোট ছোট প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কাজ শুরু করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। আবার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দিলে জামায়াত-এনসিপি মেনে নেবে না। তাহলে বিএনপি কী করতে পারে— এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে তারা আসতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে যদি তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
কেকে/এলএ