আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণ দেখিয়ে জুন মাসে ফের জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে সরকার। তবে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কমাতে ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকার এ সিদ্ধান্তকে ‘বাধ্যতামূলক’ ও ‘সীমিত পরিসরের সমন্বয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও প্রধান বিরোধী দল ও ভোক্তাদের মতে, এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বিপর্যস্ত মানুষের ওপর এটি নতুন বোঝা হিসেবে চেপে বসবে। সরকারকে অবিলম্বে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন মূল্যহার সোমবার থেকেই কার্যকর হয়েছে। নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার অকটেনের দাম ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। তবে ডিজেলের দাম আগের মতোই প্রতি লিটার ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতেই নতুন এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। সরকারের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় প্রতি মাসে বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেশীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন (বৃদ্ধি) আনার পর মে মাসে সেই মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে জুন মাসের জন্য আবারও কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধি ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারকারী এবং পরিবহন খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকায় পণ্য পরিবহন ও কৃষি খাতে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের গতিপ্রকৃতির ওপর দেশের বাজার পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও দ্রুত সেই সুবিধা ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
তিনি জানান, দেশে প্রতি মাসেই জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে এপ্রিল মাসে সমন্বয় হওয়ায় মে মাসে নতুন করে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সরকারকে নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, সরকার কখনো অপ্রয়োজনীয়ভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প ছিল না।
তিনি বলেন, ‘ডিজেলে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কম রাখতে এবারও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তারপরও কিছু খাতে পরিস্থিতির কারণে সমন্বয় করতে হয়েছে।’
জ্বালানি তেলের দাম কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অতীতে মূল্য কমানোর ক্ষেত্রে মানুষের অভিজ্ঞতা খুব ইতিবাচক নয়। তবে বর্তমান সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে এলে জনগণের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম সব দেশেই বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, যে কয়টি দেশ শেষ পর্যায়ে গিয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে দাম কম। যতটা সম্ভব সীমিত আকারে বাড়ানো হয়েছে।
গত মাসে এক দফায় জ্বালানি তেলের দাম ৮ থেকে ১২ শতাংশ, কোথাও কোথাও তারও বেশি বাড়ানোর পর আবার নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিক্রিয়া জানান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, গত মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের আয় না বাড়লেও বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। জনগণ যখন নিত্যদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন আবারও জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাদের ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, সরকার এর আগে অন্তত চলতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সরকারের পুনরায় মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ জনগণের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং চরম ধোঁকাবাজির শামিল।
তিনি আরও বলেন, বাজেট অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে তড়িঘড়ি করে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হলে তা হবে জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে, তার সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি দেশ এবং সমাজের অস্তিত্বকে আজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি বলেন, জামায়াতে ইসলামী জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের পক্ষে এবং যে কোনো ধরনের জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার থাকবে। অবিলম্বে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।
কেকে/এলএ