মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে জামায়াতের নৈরাজ্য
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১১:১৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের নিয়োগ নিয়ে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে ডাকা এক কর্মসূচিকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয় এ উত্তেজনা। তবে ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে এ পরিস্থিতির জন্য জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করছেন অনেকে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দলটির অনেক দায়িত্বশীল নেতাকর্মীকে দেখা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী ব্যাংকটিতে তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে পরিকল্পিতভাবে এ নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। সাধারণ গ্রাহক সেজে দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করছে।

গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় শুরু হওয়া এ কর্মসূচি ১০টার আগেই জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে আয়োজকদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। আয়োজকরা ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে এলেও তা প্রদর্শনের সুযোগ পাননি।

এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের হামলায় অন্তত ৫০ জন গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসলামী ব্যাংক ভুক্তভোগী গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর পুলিশের গুলি চালানো, লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস এবং জলকামান ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ সময় তিনি আন্দোলনরত গ্রাহকদের দাবির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।

এ বিষয়ে মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ব্যাংকটির কিছু গ্রাহক সড়ক অবরোধ করেছিল। আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছি।’

তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক ও আর্থিক অঙ্গনে আলোচনা চললেও বাংলাদেশ ব্যাংক আপাতত তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। ফলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে তার পদ থেকে সরানোর কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। চলমান আন্দোলন বা বিক্ষোভ কর্মসূচির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়েছে।

গতকাল এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো সিদ্ধান্তই রাস্তার আন্দোলনে পরিবর্তন হবে না। কোনো ব্যাংক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘যেকোনো ইস্যুতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিক্ষোভ প্রদর্শন বা মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ারও এখতিয়ার আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক আবেগ বা চাপের ঊর্ধ্বে থেকে কেবল প্রতিষ্ঠানের জন্য যা উপযুক্ত এবং আইনগতভাবে সিদ্ধ, সে অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ব্যাংক যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় বা সেই পরিচয়ে বড় হতে থাকে, তবে তা ওই ব্যাংকের টেকসই হওয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের বাইরে বিভিন্ন বিক্ষোভ ও কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, কোনো কোনো ব্যাংক বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠনের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হচ্ছে কিনা! বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, কোনো ব্যাংকই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না এবং রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘ব্যাংক ভবনের বাইরে রাস্তার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তবে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বা কম্পাউন্ডের ভেতরের নিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষভাবে আমলে নেয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। গভর্নর ব্যাংক কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন, কাজ করতে গিয়ে তারা যদি কোনো রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হন, তবে তা যেন সরাসরি জানানো হয়।’

সেই চাপ কর্মকর্তারা মোকাবিলা করতে না পারলে গভর্নর নিজে তা মোকাবিলা করবেন বলে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।

উল্লেখ্য, মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আন্দোলনকারীরা এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে (এস আলম) ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। একই সঙ্গে পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান পদে খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়ায় গভর্নরের পদত্যাগ দাবি করেন তারা। তাদের দাবি, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান এস আলমের দোসর। তাকে নিয়োগ দেওয়ার কারণে ব্যাংকে আবার লুটপাট হবে।

এর আগে গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খাঁনকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর দিলকুশায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। বিক্ষোভের মধ্যেই জুবায়দুরেরও পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে। রাতে খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে তিন বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৭ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের রোষানলে পড়ে খুরশীদ আলমসহ চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। চাকরিজীবনেও খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলেন তার কিছু সহকর্মী। বাংলাদেশ ব্যাংকের রংপুর অফিসের জেনারেল ম্যানেজার (বর্তমানে পরিচালক পদ) থাকাকালে তার গৃহীত ছাদবাগান কর্মসূচিকে ঘিরে ওই অভিযোগ তোলা হয়।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে যেসব আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে, সেসবের তদন্ত অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ওই তদন্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভিযোগের সত্যতা পায়নি। ফলে জেনারেল ম্যানেজার (বর্তমানে পরিচালক পদ) থেকে ধাপে ধাপে নির্বাহী পরিচালক এবং ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগ পান খুরশীদ আলম।

এ ছাড়া এ প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে দখল-বেদখল নিয়ে আগেও সংঘর্ষ হয়েছে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক পুনর্গঠন করা হয়। এস আলমের প্রায় ৮৩ শতাংশ শেয়ার ব্লক করে রাখা হয়।

ব্যাংকটিকে এস আলমমুক্ত করতে গেলে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট রাজধানীর দিলকুশায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের বাইরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার সময় ২০১৭ সালের আগে ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং এর পরে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। গুলিতে বেশ কয়েকজন আহত হন।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ইসলামী ব্যাংক   জামায়াত   নৈরাজ্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close