কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় চাঞ্চল্যকর ব্যবসায়ী জোবায়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জেলা পুলিশের বিরুদ্ধে নিহত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে নিয়ে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার।
এক সংবাদ সম্মেলনে নিহত জোবায়েরের বড় ভাই মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘জোবায়ের হত্যার পর কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এমন কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
বিশেষ করে ওই বিবৃতিতে রানা নামের এক ব্যক্তিকে নিহত জোবায়েরের মামাতো ভাই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরিবারের দাবি, রানা জোবায়েরের কোনো আত্মীয় নন; তিনি জোবায়েরের প্রতিষ্ঠানে সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই এ ধরনের তথ্য প্রচার করায় নিহত জোবায়েরের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং পরিবারটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় তাদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
তার ভাষ্য, কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে নিহত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে ঘিরে বিতর্কিত বা সম্মানহানিকর তথ্য প্রকাশ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। একজন নিহত ব্যক্তি নিজের পক্ষে কথা বলার সুযোগ পান না। তাই এ ধরনের তথ্য প্রকাশে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
তবে নিহতের বড় ভাই মো. নাজমুল হাসান পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপেরও প্রশংসা করে বলেন, “হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন আসামিকে আটক করেছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।” একই সঙ্গে তারা তদন্ত-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি তথ্য যাচাই-বাছাই করে দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপনের আহ্বান জানান।
মো. নাজমুল হাসান কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— জোবায়ের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা, দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিহত ব্যক্তির সম্মানহানিকর বা বিতর্কিত তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা এবং পুলিশের প্রকাশিত তথ্যে কোনো অসংগতি থাকলে তা পুনর্মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া।
এ ছাড়া নিহত জোবায়েরের পরিবারকে ন্যায়বিচার পেতে সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যতে যাচাই-বাছাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার বন্ধের দাবিও জানানো হয়।
মো. নাজমুল হাসান বলেন, “এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য নয়; বরং একজন নিহত মানুষের ন্যায়বিচার, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং একটি অসহায় পরিবারের কান্নার প্রতিধ্বনি।” তারা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোবায়ের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে, পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি ছুটিতে রয়েছেন।
পাকুন্দিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) খোকন চন্দ্র সরকার বলেন, “আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কপি এখনো আমাদের হাতে পৌঁছেনি। জবানবন্দিতে কী বলা হয়েছে, সেটি হাতে পেলে বিস্তারিত বোঝা যাবে। আমরা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করছি। তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে আসামির ভাষ্যমতে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। এখানে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জুবায়ের নিজেই হত্যার কথা স্বীকার করেছে। এখন এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী রহস্য বা কারণ রয়েছে, সেটি উদ্ঘাটন করাও আমাদের দায়িত্ব।”
সংবাদ সম্মেলনে নিহতের মা নার্গিস বেগম, বাবা আলতাফ উদ্দিন, স্ত্রী সোনিয়া, ছোট ভাই জুনায়েদ, সুখিয়া বিএনপির নেতা মনিরুল ইসলাম শামীমসহ স্থানীয় এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (২৯ মে) রাতে পাকুন্দিয়া উপজেলার কোদালিয়া-হোসেনপুর সড়কের শৈলজানি এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জোবায়ের (২৫) নিহত হন। তিনি উপজেলার চরপলাশ গ্রামের বাসিন্দা ও মো. আলতাফ উদ্দিনের ছেলে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে পাকুন্দিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে পুলিশ জোবায়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রানা নামে এক যুবককে আটক করে।