মঞ্চনাটক, সংগীত, অ্যাথলেটিকস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সক্রিয় পদচারণায় চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক পরিচিত মুখ সাবিরা সুলতানা বীনা। আজ ২ জুন তার ৬৩তম জন্মদিন। ১৯৬৩ সালের এই দিনে খুলনার কয়রায় জন্ম নেওয়া বীনা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নাট্যচর্চা, অভিনয় ও নির্দেশনার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে চলেছেন দেশের নাট্যাঙ্গন।
নাট্যজন বীনা মঞ্চনাটক, অভিনয়, নির্দেশনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। চট্টগ্রামের নাট্যচর্চার ইতিহাসে তার মতো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক সক্রিয়তার অধিকারী নারী নাট্যকর্মী খুব বেশি নেই। নাটকের প্রতি ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন দক্ষ অভিনেত্রী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন নাট্যদলের প্রযোজনায় অভিনয়ের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন তিনি। তার জন্মদিনে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছে এই প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্বকে।
বাবার চাকরির সুবাদে চট্টগ্রামের পোর্ট কলোনিতে বসবাস শুরু বীনার পরিবারের। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন বাঁচাতে পরিবারের সাথে আশ্রয় নেন হালিশহরের বিখ্যাত কোরবান আলী সওদাগর বাড়িতে। দীর্ঘ ৯ মাস এই পরিবারের সাথে বসবাস করতে গিয়ে চট্টগ্রাম ও এর সংস্কৃতির সাথে নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন সাবিরা সুলতানা বীনা ও তার পরিবার।
ডা. খাস্তগীর উচ্চ বিদ্যালয় হতে মাধ্যমিক, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) থেকে সমাজতত্ত্বে এমএসএস করেন তিনি।
সংগীতের মাধ্যমে শিশুকাল থেকেই সংস্কৃতি চর্চা শুরু বীনার। ইসহাক মামার কাছে সংগীতে হাতেখড়ি। পরবর্তী ওস্তাদ আবুল হোসেনের কাছে দীর্ঘদিন শুদ্ধ সংগীতের তালিম নিয়েছেন। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে রবীন্দ্র সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত প্রতিযোগিতায়ও পুরস্কৃত হয়েছেন।
স্কুল জীবন থেকেই পড়াশোনা, নাচ গানের পাশাপাশি অ্যাথলেটিক্সে যুক্ত ছিলেন তিনি। আগ্রাবাদের নওজোয়ান ক্লাবের হয়ে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। চবিতে পড়ার সময়ও নিয়মিত অ্যাথলেটিক্সে অংশ নিয়েছেন।
১৯৮৩ সালে ‘পদধ্বনি নাট্যগোষ্ঠী’ প্রথম প্রযোজনা সেলিম আল দীনের ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি‘ নাটকের মাধ্যমে সাবিরা সুলতানা বীনার মঞ্চযাত্রা শুরু হয়। একই বছরের ১৯ আগস্ট সহকর্মী মুনির হেলালের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ক্রমেই যুক্ত হয়ে পড়েন থিয়েটার চর্চার মূল স্রোতধারায়। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অন্যতম নাট্য সংগঠন ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়’র সাথে যুক্ত হয়ে অভিনয় করেছেন মমতাজউদ্দীন আহমেদের ফলাফল নিম্নচাপ, খসরুল কবীরের ভোলা ময়নার বায়স্কোপ, ব্রেখটের রাইফেল, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লাল শালু, সৈয়দ শামসুল হকের তোরা সব জয়ধ্বনি কর, জিয়া হায়দারের এলেবেলে, লিও টলস্টয়ের পাপপুণ্য ও তারা শংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি নাটকে।
এছাড়াও সাবিরা সুলতানা বীনা প্রতিভাস প্রযোজনা সফোক্লিসের ইডিপাস অবলম্বনে ‘জায়া প্রজায়িনী, বিজয় টেন্ডুলকরের চোপ আদালত চলছে, নান্দীমুখ প্রযোজনা বেলা শেষের গল্প, লাল লণ্ঠন, শব্দ নাট্য চর্চা কেন্দ্র প্রযোজনা জীবন যেমন, একাডেমি অফ পারফর্মিং আর্টস প্রযোজনা গোধূলির আলো, চোপ আদালত চলছে, অঙ্গন থিয়েটার ইউনিটের শেষ বিকেলের গল্প, বিনোদিনী থিয়েটারের এখনো ক্রীতদাস, বিটা প্রযোজনা দুঃখিনী নাটকে অভিনয় করেছেন।
তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন তারই লেখা অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনা ‘আমার স্বাধীনতা’।
সাবিরা সুলতানা বীনা জিয়া হায়দার, শিশির দত্ত, কামাল উদ্দিন নীলু, মুনির হেলাল, বিভাস চক্রবর্তী, ঊষা গাঙ্গুলি, সারা যাকের, সনজীব বড়ুয়া, অভিজিৎ সেনগুপ্ত, মোসলেম উদ্দীন সিকদার লিটন প্রমুখের নির্দেশকের নির্দেশনায় কাজ করছেন।
পেশায় অধ্যাপিকা সাবিরা সুলতানা বীনা চলচ্চিত্র, শর্ট ফিল্ম, টিভি নাটকে অভিনয় উপভোগ করলেও মঞ্চে অভিনয়ই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
মঞ্চকে সবচেয়ে আপন মাধ্যম মনে করা সাবিরা সুলতানা বীনা আজও নাট্যশিল্পের বিকাশে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। তার জন্মদিনে সংস্কৃতিমনা মানুষেরা স্মরণ করছেন নাটকের প্রতি তার দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, শ্রম ও অবদানকে।
তথ্য সূত্র : স্কেচ গ্যালারি- নন্দন, নাট্যাধারের প্রকাশনা।
কেকে/এমএ