মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
তিন মাসে বেড়েছে ৩১,৪৮৭ কোটি টাকা
খেলাপি ঋণে ঊর্ধ্বগতি
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৯:১৪ এএম আপডেট: ০৩.০৬.২০২৬ ১২:৩২ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় ধীর হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ বিতরণ তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমছে। বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার এবং নগদ প্রবাহে চাপের কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। একই সময়ে পুরোনো ঋণ আদায়ে দুর্বলতার কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক ব্যাংক নতুন করে ঝুঁকি নিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ফলে ঋণ অনুমোদনের গতি আরও ধীর হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এক প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এ হার ছিল ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।

তিন মাস আগের চিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

ফলে এক প্রান্তিকের ব্যবধানে সব ধরনের ব্যাংকেই শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেড়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ হার বেড়েছে ১ দশমিক ৪১ শতাংশ পয়েন্ট, বিশেষায়িত ব্যাংকে ০ দশমিক ৯৮ শতাংশ পয়েন্ট এবং বিদেশি ব্যাংকে ০ দশমিক ৩২ শতাংশ পয়েন্ট।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যাংক খাতে উদ্বেগজনক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি ১২ লাখ টাকা, যা তিন মাস আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ফলে এক প্রান্তিকে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

একই সময়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চাপও বেড়েছে। প্রভিশন ও স্থগিত সুদ সমন্বয়ের পর মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের নিট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ০১ শতাংশ, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে নিট খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ০৮ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণে ধীরগতির প্রবণতা অব্যাহত থাকলেও গত এক বছরে মোট ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকায়। এ সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এক বছরে এ খাতে ঋণ বেড়েছে ৭২ হাজার ৮৮৫ কোটি ৬ লাখ টাকা বা ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে, বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে কম, মাত্র ০ দশমিক ৯২ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা আগের বছরের তুলনায় এখনো তুলনামূলক ধীর, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক। সেজন্য আগের খেলাপি ঋণের সুদ যোগ হয়ে মোট পরিমাণ ও হার—দুটোই বেড়েছে।’

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। পরবর্তী দেড় দশকেরও বেশি সময়ে তা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালের জুন শেষে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন প্রশাসনের সময়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন প্রতিবেদনে আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসতে শুরু করে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক বড় ঋণগ্রহীতা আড়ালে চলে যাওয়ায় ঋণ আদায়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ সুবিধার আওতায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলে খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা কমে আসে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  খেলাপি   ঋণ   ঊর্ধ্বগতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close