রোববার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৭ জুন ২০২৬
শিরোনাম: ভারতে মোদি সরকারের পতনের শঙ্কা তৈরি করছে ‘তেলাপোকা পার্টি’      হাসপাতাল নিজেই আইসিইউতে চলে গেছে : এমপি সানসিলা      টানা দুই মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি      অ্যাডহক কমিটির প্রধান থেকে বিসিবির সভাপতি তামিম      তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে সংসদে শোকপ্রস্তাব      ঢাকা থেকে ১২৪৪টি পত্রিকা প্রকাশিত হয় : সংসদে তথ্য প্রতিমন্ত্রী      মতিঝিলে ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাই      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে উদ্বেগ: সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জনআস্থা রক্ষাই সময়ের দাবি
রফিকুল আলম রঞ্জু
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ৭:৪৬ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ব্যাংকিং খাত। দেশের শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি উন্নয়ন, রপ্তানি, আমদানি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সাধারণ মানুষের সঞ্চয়—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্যাংকসমূহ। একটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর। তাই কোনো বৃহৎ ব্যাংককে ঘিরে অনিশ্চয়তা, বিতর্ক বা আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সমগ্র অর্থনীতি ও সমাজে প্রতিফলিত হয়।

সম্প্রতি দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে নতুন করে নানা আলোচনা, উদ্বেগ ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রতিষ্ঠাতা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, অতীতে ব্যাংকিং খাতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সমালোচিত কিছু গোষ্ঠী পুনরায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে। যদিও এসব অভিযোগের যথার্থতা নিরূপণ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, তবে জনমনে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ব্যাংক শুধু দেশের প্রথম ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকই নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলামী ব্যাংকিং আন্দোলনেরও অন্যতম পথিকৃৎ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ব্যাংকটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রেমিট্যান্স আহরণ, শিল্প ও বাণিজ্য অর্থায়ন, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইসলামী ব্যাংকের অবদান ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।

কিন্তু বিগত এক দশকে দেশের ব্যাংকিং খাতে নানা অনিয়ম, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তার প্রভাব ইসলামী ব্যাংকও এড়াতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালন কাঠামোতে পরিবর্তন, ঋণ বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা দেখা গেছে। এসব ঘটনার ফলে বহু গ্রাহকের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং ব্যাংকের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থায় চিড় ধরেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো গ্রাহকের আস্থা। একটি ব্যাংকের ভবন, প্রযুক্তি বা সম্পদ যত বড়ই হোক না কেন, গ্রাহকের আস্থা হারিয়ে গেলে সেই প্রতিষ্ঠান মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক সময় গুজব বা আস্থাহীনতার কারণেই আমানতকারীরা হঠাৎ অর্থ উত্তোলনে ঝুঁকে পড়েছেন এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমানে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে মানববন্ধন, কলম বিরতি, প্রতিবাদ সমাবেশ ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা ব্যাংকের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হলো, ব্যাংক পরিচালনায় এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে যাদের পেশাগত দক্ষতা, সততা এবং জনআস্থা প্রশ্নাতীত। একই সঙ্গে ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী যেকোনো প্রভাব বা হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প নেই। এ অবস্থায় কোনো বড় ব্যাংককে ঘিরে আস্থার সংকট তৈরি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়তে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মসংস্থান। ইসলামী ব্যাংক এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু গ্রাহকরাই নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবা খাতও প্রভাবিত হতে পারে। তাই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

অনেক গ্রাহক ও সচেতন মহল মনে করেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আরও অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি এবং পেশাজীবীদের মতামত বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। আধুনিক করপোরেট ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে সব ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য, তারল্য পরিস্থিতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেট সুশাসন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। তাই ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে সমানভাবে কঠোর ও নিরপেক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। যেকোনো অভিযোগ, অনিয়ম বা বিতর্কের ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণই জনআস্থা পুনর্গঠনের প্রধান উপায়।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাও সময়ের দাবি। ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়; এটি জনগণের আমানত দ্বারা পরিচালিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রতিহিংসা বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাংকিং খাতকে ব্যবহার করা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ জনগণ এবং জাতীয় অর্থনীতি। রাষ্ট্র, সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এ বিষয়ে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বচ্ছতা। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা, পরিচালনা কাঠামো, ঋণ পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য জানাতে হবে। গোপনীয়তা, অস্পষ্টতা বা তথ্যের ঘাটতি জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করে, যা আস্থার সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। অন্যদিকে খোলামেলা তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহিমূলক আচরণ আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থে ইসলামী ব্যাংককে একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সুশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি। ব্যাংকটি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থে নয়; বরং কোটি গ্রাহকের আমানত এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে পরিচালিত হওয়া উচিত। এ লক্ষ্যে প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি জনআস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান উদ্বেগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের উচিত দায়িত্বশীলতা, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যাংক পরিচালিত হলে শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, সমগ্র দেশের ব্যাংকিং খাতই উপকৃত হবে। আর একটি শক্তিশালী ও আস্থাশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, প্রেসক্লাব পাবনা

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  ইসলামী ব্যাংক   উদ্বেগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close