খেলার মাঠে মেতে থাকার বয়সে দুটি অবুঝ শিশু খোলা আকাশের নিচে মুক্তির প্রহর গুনছে- পঞ্চগড় সীমান্ত থেকে আসা এই দৃশ্য যে কোনো বিবেকবান মানুষকে তাড়িত না করে পারে না। টানা ৯০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নারী ও শিশুসহ ১০ জন মানুষ সীমান্তের শূন্যরেখার ওপারে, রোদ-বৃষ্টি ও ফসলি জমির কাদাপানিতে আটকে আছেন।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের (অনুপ্রবেশ) এই চেষ্টা কেবল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনও বটে। বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হলেও সীমান্তে যে মানবিক ট্র্যাজেডি তৈরি হয়েছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আটকে পড়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, তাদের মধ্যে একটি পরিবারের কাছে ভারতীয় ‘আধার কার্ড’ রয়েছে এবং তারা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার স্থায়ী বাসিন্দা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আধার কার্ডধারী ভারতীয় নাগরিকদের কেন বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করা হচ্ছে? যদি তারা ভারতের বৈধ নাগরিক হয়ে থাকেন, তবে তাদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষার সম্পূর্ণ দায় ভারতের।
আর যদি কোনো আইনি জটিলতা থেকেও থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। এভাবে রাতের অন্ধকারে কিংবা জোরপূর্বক পুশইনের মাধ্যমে মানুষকে কাঁটাতারের ফাঁদে ফেলে দেওয়া কোনো বন্ধুপ্রতিম বা সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় মানবিক ট্র্যাজেডি হলো মানুষের ‘রাষ্ট্রহীন’ বা দেশহীন হয়ে যাওয়া। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের ১৯৫৪ সালের কনভেনশন অনুযায়ী, রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি হলেন তিনি, যাকে কোনো রাষ্ট্রই তাদের আইনানুযায়ী নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। অর্থাৎ, আধুনিক রাষ্ট্রকেন্দ্রিক পৃথিবীতে এই মানুষেরা কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ ‘অদৃশ্য’ ও পরিচয়হীন।
বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক হান্নাহ আরেনড মানুষের এই অবস্থাকে আখ্যা দিয়েছেন ‘অধিকার পাওয়ার অধিকার’ হারিয়ে ফেলা হিসেবে দেখেন। কারণ নাগরিকত্ব ছাড়া একজন মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান বা আইনি সুরক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হন। ভারত বাংলাদেশের সীমান্তে আমরা সেই অমানবিক দৃশ্যই দেখতে পাচ্ছি। এই পৃথিবীর একজন বাসিন্দা হিসেবে দেশহীন হয়ে যাবার মতো নির্মম ঘটনা আর হতে পারে না ।
এই মানবিক সংকট নিরসনে বিজিবি ও বিএসএফ-এর মধ্যে কোম্পানি এবং ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একাধিক পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভারতপক্ষ তাদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিজিবি সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে যে কঠোর টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে, তা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রশংসনীয়।
তবে খোলা আকাশের নিচে ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত ও চিকিৎসাবঞ্চিত এই মানুষগুলোর, বিশেষ করে শিশুদের মানবেতর পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে একটি দ্রুত মানবিক সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্কের খাতিরে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা ও মানবিক হওয়া জরুরি।
আমরা আশা করি, ভারতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখবে এবং তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে এই অমানবিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাবে।
একই সঙ্গে, সীমান্তকে যে কোনো ধরনের অবৈধ পুশইন থেকে মুক্ত রাখতে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে আরও জোরালো অবস্থান বজায় রাখতে হবে। মানবিকতার জয় হোক, সীমান্ত সংকট দূর হোক।
কেকে/ এমএস