এক সময় পৃথিবীর বহু সমাজে কন্যাসন্তান অবহেলা, বৈষম্য ও অপমানের শিকার ছিল। বিশেষ করে জাহেলি আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মকে দুর্ভাগ্য ও লজ্জার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। এমনকি অনেক পিতা নিজের নবজাতক কন্যাকে জীবন্ত কবর দিতেও দ্বিধা করত না। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এটি ছিল এক অমানবিক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়।
ঠিক এমন এক অন্ধকার সময়ে ইসলাম কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। যে কন্যাসন্তানকে সমাজ বোঝা মনে করত, ইসলাম তাকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত, পরিবারের বরকত এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, “তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।” (সুরা শুরা: ৪৯)
মুফাসসিরদের মতে, এ আয়াতে প্রথমে কন্যাসন্তানের কথা উল্লেখ করার মধ্যেই তার মর্যাদা ও গুরুত্বের বিশেষ ইঙ্গিত রয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করে কন্যাসন্তানের সম্মান প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যাসন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মূল্যবান আমানত। তাদের সঠিকভাবে লালন-পালন, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দায়িত্ব পালন করলে তা পিতা-মাতার জন্য জান্নাতের কারণ হতে পারে। মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এভাবে একসঙ্গে থাকব।” (সহিহ মুসলিম)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, “যার ঘরে কন্যাসন্তান আসে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে কন্যাসন্তান কোনো বোঝা নয়; বরং আল্লাহর রহমত ও অশেষ কল্যাণের উৎস।
দুঃখজনকভাবে আধুনিক যুগেও অনেক পরিবারে কন্যাসন্তানের জন্মকে আনন্দের পরিবর্তে হতাশার চোখে দেখা হয়। কোথাও তাদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত করা হয়, কোথাও আবার উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। অথচ এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।
মহানবী (সা.) নিজ জীবনে কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) তাঁর কাছে এলে তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, সাদরে গ্রহণ করতেন এবং নিজের আসনে বসাতেন। এর মাধ্যমে তিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে শিক্ষা দিয়েছেন যে কন্যাসন্তান সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসার পূর্ণ অধিকারী।
কন্যাসন্তানের হক আদায় শুধু খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজের উপকারী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলাও পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
প্রখ্যাত ইসলামী মনীষী ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, “সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। তাকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে, সে সেভাবেই বেড়ে উঠবে।”
প্রকৃতপক্ষে একজন কন্যাসন্তানকে সৎ, শিক্ষিত ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে তোলা মানে শুধু একজন মানুষকে গড়ে তোলা নয়; বরং একটি সুন্দর পরিবার, আদর্শ সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্মাণ করা। কারণ একজন মা-ই একটি জাতির প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আজকের বিশ্বে নারী নির্যাতন, বৈষম্য ও নৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ইসলামের এই মহান শিক্ষাগুলো নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। ইসলাম কন্যাসন্তানকে করুণার নয়, বরং মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
তাই কন্যাসন্তানের জন্মে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক মহামূল্যবান নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কারণ যে ঘরে কন্যাসন্তানকে সম্মান করা হয়, তার অধিকার রক্ষা করা হয় এবং তাকে আল্লাহর আমানত হিসেবে লালন করা হয়, সেই ঘরেই নেমে আসে রহমত, শান্তি ও বরকত।
কন্যাসন্তান বোঝা নয়; সে আল্লাহর উপহার, পরিবারের গর্ব এবং জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক মহামূল্যবান সুযোগ।
কেকে/ এমএস