মৌলভীবাজারে পাহাড় আর টিলাজুড়ে এখন লাল টকটকে পাকা লিচুর সমারোহ। জেলার বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়ি টিলা, বাগান ও বাড়ির আঙিনায় সারি সারি লিচুগাছ ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে থাকা রসালো লিচুর থোকা এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, চাঙ্গা করে তুলেছে স্থানীয় অর্থনীতিও। কৃষক, বাগান মালিক, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন লিচু সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লিচুর ফলন হয়েছে অত্যন্ত ভালো। ঝড়ঝাপটার বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। বাদুড়, বানর ও কাঠবিড়ালির কিছু উৎপাত থাকলেও তা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেনি। ফলে জেলার চাষিদের মুখে এখন হাসি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর জেলার ৩০৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪৭ হাজার লিচুগাছে ফল এসেছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৩০ টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। গত বছর প্রায় ২৮ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়েছিল। এবার ফলন ও বাজারদর ভালো থাকায় সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বর্ষিজোড়া, জগন্নাথপুর, শ্যামেরকোনা, কাগাবলা ইউনিয়নের বুরুতলা, কমলগঞ্জের কালাছড়া ও শমশেরনগর, রাজনগরের টেংরা, কুলাউড়ার চাতলা, জুড়ী ও বড়লেখার টিলাভূমিতে সবচেয়ে বেশি লিচু চাষ হচ্ছে। বর্তমানে ছোট-বড় শতাধিক বাগানের পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা ও অন্যান্য ফলের বাগানেও লিচুর আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মৌলভীবাজার শহরের চৌমুহনা, কোর্ট রোড, পশ্চিম বাজার, কুসুমবাগ, চাঁদনীঘাটসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় লিচুর পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। বাজারে মাদ্রাজি, বোম্বাই, বেদানা, চায়না-৩, বারী-৩, বারী-৪ ও মঙ্গলবারি জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে। আকার ও মানভেদে প্রতি ১০০ লিচু ২৫০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কাগাবলা ইউনিয়নের বুরুতলার লিচুচাষি হুমায়ূন কবীর জানান, তার ৭৬টি গাছের লিচু ২ লাখ ২১ হাজার টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, “এবার একদম বাম্পার ফলন হয়েছে। পাঁচটি গাছ নিজেদের জন্য রেখে বাকিগুলো বিক্রি করেছি।”
ভানুগাছ স্টেশন রোডের ফল বিক্রেতা দিনার মিয়া বলেন, “এ বছর শমশেরনগর এলাকায় ২০টি গাছ কিনেছি। আমাদের কাছে স্থানীয় এলাকার লিচুর চাহিদা বেশি। কারণ এই লিচুতে কোন ধরণের রাসায়নিক ব্যবহার করেন না গাছের মালিকরা।”
শ্রীমঙ্গলের ফল ব্যবসায়ী মুহাম্মদ কালু গাজী বলেন, “আমি বিভিন্ন এলাকা থেকে স্থানীয় লিচু পাইকারি কিনে খুচরা বিক্রি করছি। আকারভেদে ১০০ লিচু ২৫০ থেকে ৩২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি।”
অন্যদিকে শমশেরনগরের লিচুচাষি আব্দুর রহমান জানান, তার পাঁচটি পুরনো গাছ থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকার লিচু বিক্রি হয়েছে। স্থানীয় পাইকার সুন্দর আলী বলেন, শমশেরনগরের রাসায়নিকমুক্ত লিচুর চাহিদা জেলা ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকাতেও রয়েছে।
ক্রেতা আরমান আলী বলেন, “আমি ১০০ লিচু কিনেছি ২৫০ টাকায়। স্থানীয় লিচু হলেও স্বাদ ভালো, মিষ্টি আছে। দামও সহনীয়।”
কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ, মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং পোকামাকড় দমনের সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে লিচু চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে।”
কেকে/এজে