ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে ধারাবাহিক কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের অপসারণ দাবিতে এবার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন নারীরাও। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের বড় একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থক। ব্যাংকটির বেশিরভাগ কর্মকর্তাও জামায়াতপন্থি। যার ফলে ইসলামী ব্যাংক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দলটি। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর থেকেই দলটির নেতাকর্মীরা ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এতদিন পুরুষ কর্মীরা মাঠে সক্রিয় থাকলেও এবার আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন নারী কর্মীরাও। এমনকি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘নতুন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে অযোগ্য ব্যক্তিকে বসানো হয়েছে। এস আলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শেখ হাসিনা সরকার ব্যাংকটিকে ধ্বংস করেছে। সেই এস আলমকে আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। মানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হবে।’ গতকাল মঙ্গলবার বিকাল ৩টা ৩ মিনিটে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের (বীর বিক্রম) সভাপতিত্বে শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন।
একই সংসদ অধিবেশনে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘এস আলম গ্রুপ অতীতে ২৬টি ভুয়া কোম্পানি গঠন করে ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সরিয়েছে। সরকার আবারও ব্যাংকটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসিয়ে জনগণের টাকা লুটপাটের নতুন ব্যবস্থা করেছে।’
এদিকে জামায়াতের এ দুই নেতার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়, আবার জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, সব বিষয়ে ইসলামের দোহাই দেওয়া মোটেও সমীচীন নয়।
ব্যাংকটিতে চলমান আন্দোলনের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের বৈধ গ্রাহকদের কোনো সমস্যা হবে না এবং নিয়মানুযায়ী তাদের মালিকানা নিশ্চিত করা হবে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, পর্দার আড়ালে থেকে ব্যাংকটিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গ্রাহকের নামে আন্দোলন চালানো হচ্ছে। এসব আন্দোলন করে বেশিদূর এগোনো যাবে না।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পর্ষদ সদস্যদের নিয়োগ বা অব্যাহতির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক যে কোনো সময় পর্ষদকে অব্যাহতি দিতে পারে। যদি এ প্রক্রিয়ায় কোনো প্রশ্ন তুলতে হয়, তবে আগে আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব আনতে হবে। পাশাপাশি নাবিল গ্রুপসহ যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে। একইসঙ্গে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা বা সিআরআর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমের নিয়োগকে ঘিরে ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন। এর প্রভাবে ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সিআরআর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আমাদের প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্ট এখনো পজিটিভ আছে। তবে সিআরআর ঘাটতি হয়ে গেছে। প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টে সিআরআর মেইনটেইন করার জন্য সীমা থাকে। সেই সীমার নিচে গেলে সিআরআর ঘাটতি হয়ে যায়। ব্যাংক এখন সেই সীমার নিচে চলে গেছে।
তিনি বলেন, প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টে ৭ হাজার ১৫ কোটি টাকা ছিল। কিন্তু সেটা এখন কমে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে গেছে। এজন্য আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চেয়েছি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে এস আলম গ্রুপ ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যাংক সিআরআর ঘাটতিতে পড়ে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলতি হিসাবে অর্থ রাখতে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। কয়েক মাসের মাথায় সিআরআর ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলতি হিসাবে অর্থ জমা রাখতে সক্ষম হয়। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফের ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতা শুরু হয়। গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। ওইদিন রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তার নিয়োগের বিরোধিতা করে বিভিন্ন ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে আসছেন একদল গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার। সেই ধারাবাহিকতায় টানা নবম দিনের মতো গতকালও ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা।
কেকে/এলএ