শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: অপরিকল্পিত নগরায়ণে চট্টগ্রামজুড়ে বিশৃঙ্খলা      ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে : আইনমন্ত্রী      প্রতিরক্ষা চুক্তির আগে মক্কায় শীর্ষ নেতাদের জুমার নামাজ আদায়      গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত করা যাবে না: অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি      রাজধানীতে রাত একটার মধ্যে হতে পারে বজ্রসহ বৃষ্টি      দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্যে সমর্থন নেই ভারতের      হামে আরও তিন শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২১৮      
খোলাকাগজ স্পেশাল
অপরিকল্পিত নগরায়ণে চট্টগ্রামজুড়ে বিশৃঙ্খলা
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

চট্টগ্রাম শহরটি যেন দুই রূপে দাঁড়িয়ে আছে। একটি কাগজে—সেখানে ভবনের সামনে রয়েছে জায়গা, পাশে পর্যাপ্ত ফাঁকা স্থান, নিচতলায় গাড়ি রাখার ব্যবস্থা, ড্রেন-খাল উন্মুক্ত, জলাধার সংরক্ষিত। আরেকটি বাস্তবে—যেখানে ভবন গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান, খালের ওপর স্থাপনা, পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন, পাহাড় কেটে আবাসিক প্রকল্প। এই দুই চিত্রের মধ্যে ব্যবধানের সরকারি স্বীকৃতিই যেন মিলেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাম্প্রতিক মূল্যায়নে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া ২৯ হাজার ৭০০টি ভবনের প্রায় ৯৯ শতাংশই অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। সংখ্যাটি শুধু বিস্ময়কর নয়, নগর পরিকল্পনা, প্রশাসনিক তদারকি এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। কারণ, একটি ভবন একদিনে তৈরি হয় না। ভিত্তি খনন থেকে ছাদ ঢালাই পর্যন্ত কয়েক মাস, কখনো কয়েক বছর সময় লাগে। সেই সময়ে নির্মাণের বিভিন্ন ধাপে সিডিএর পরিদর্শনের সুযোগ থাকে। তাহলে হাজার হাজার ভবন কীভাবে নিয়ম ভেঙে দাঁড়িয়ে গেল? এ প্রশ্ন এখন নগরজুড়ে।

নকশা অনুমোদন আর বাস্তব নির্মাণ—দুই ভিন্ন পৃথিবী

সিডিএর অনুমোদিত নকশায় প্রতিটি ভবনের উচ্চতা, সেটব্যাক, পার্কিং, খোলা জায়গা, অগ্নিনিরাপত্তা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং ভবনের অবস্থান নির্ধারণ করা থাকে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কোথাও ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ হয়েছে ১০ বা ১২ তলা। কোথাও সামনের পাঁচ ফুট খালি জায়গা পুরোপুরি দখল করা হয়েছে। কোথাও পাশের বাধ্যতামূলক ফাঁকা স্থান নেই। অনেক ভবনের নিচতলার পার্কিং এখন মার্কেট বা শোরুম। কোথাও ড্রেনের ওপর ভবনের অংশ ঝুলছে। আবার কোথাও রাস্তার সীমানা পর্যন্ত চলে এসেছে বহুতল ভবন। এসব অনিয়ম নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে দৃশ্যমান। তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

সচেতন মহলের প্রশ্ন—১৫ বছরে কী করেছে তদারকি বিভাগ? নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভবনের নকশা অনুমোদনের পর সিডিএর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আইন অনুযায়ী নির্মাণকাজ চলাকালে বিভিন্ন ধাপে পরিদর্শন, অনিয়ম শনাক্ত এবং প্রয়োজনে নির্মাণ বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে সংস্থাটির। তাহলে একটি ছয়তলার ভবন যখন সপ্তম তলা তুলছে, তখন কি কেউ দেখেননি? অষ্টম তলা হওয়ার সময়? নবম তলায়? দশম তলায়? যদি দেখে থাকেন, ব্যবস্থা নেননি কেন? আর যদি না দেখে থাকেন, তাহলে তদারকি ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে? সচেতন নগরবিদদের মতে, ২৯ হাজার ভবনের অনিয়ম একদিনে হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। কেবল ভবন মালিক নয়, এর দায় অনুমোদন ব্যবস্থারও ওপরও বর্তায়।

চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ শোনা যায়—নকশা অনুমোদনের পর বাস্তব নির্মাণে কার্যকর নজরদারি দুর্বল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর গিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলেও তা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে ভবন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। এরপর উচ্ছেদ বা সংশোধন কার্যত কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের প্রয়োগ যদি নির্মাণের শুরুতেই নিশ্চিত করা যেত, তাহলে আজ হাজার হাজার নকশাবহির্ভূত ভবন দাঁড়ানোর সুযোগ পেত না।

পুকুর, খাল ও জলাধার—উঠছে পুরোনো বিতর্ক

চট্টগ্রামের নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য পুকুর, জলাধার ও খাল হারিয়ে গেছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, বহু জলাধার ভরাট করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের একাংশের প্রশ্ন, অতীতে ভূমির প্রকৃতি নির্ধারণ, সাইট পরিদর্শন এবং অনুমোদন প্রতিবেদনে সব ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে জলাধার বা খালসংলগ্ন এলাকা নিয়ে অনুমোদন প্রক্রিয়া বিতর্কিত ছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি তদন্ত বা নিরপেক্ষ নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি কোথাও জলাধারকে সমতল ভূমি হিসেবে দেখিয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেই নথি, জরিপ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা পুনঃপর্যালোচনা করা জরুরি।

পার্কিং দখলেই বাড়ছে যানজট

চট্টগ্রামের বহু ভবনে অনুমোদিত পার্কিং এলাকা এখন দোকান, ব্যাংক, গুদাম বা অফিস। ফলে গাড়ি রাখার জায়গা না পেয়ে সড়কেই পার্কিং করতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ ভবনের ভেতরে পার্কিং সুবিধা না থাকা। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পার্কিং দখলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নতুন ফ্লাইওভার বা সড়ক নির্মাণ করেও যানজট পুরোপুরি কমানো যাবে না। জলাবদ্ধতার পেছনেও কি নকশাবহির্ভূত নির্মাণ? প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রামের বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, এর পেছনে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণও বড় কারণ। ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা না রাখা, ড্রেন সংকুচিত করা, খাল দখল, জলাধার ভরাট—এসব কারণে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ নষ্ট হয়েছে। ফলে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে নগরের বিভিন্ন এলাকা।

দুর্যোগে বাড়ছে ঝুঁকি

অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের সময় ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা না থাকলে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় বলেছেন, নগরের অনেক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি প্রবেশ করানোই সম্ভব হয় না। অনেক ভবনে জরুরি নির্গমন পথও ব্যবহারযোগ্য নেই। ফলে শুধু আইন ভঙ্গ নয়, জননিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

এবার কঠোর সিডিএ

দায়িত্ব নেওয়ার পর সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অনুমোদিত নকশা অমান্য করলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়া হবে না। কয়েকটি ভবন ও হাসপাতালকে ইতোমধ্যে অবৈধ অংশ অপসারণে নোটিশও দেওয়া হয়েছে। তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, যে ২৯ হাজার ভবন ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে?

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অমীমাংসিত

সচেতন মহল আরও প্রশ্ন তুলছেন—২৯ হাজার ৭০০ ভবনের মধ্যে কতটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে? কতটি ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে? কতজন কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলার জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছেন? তারা বলেন, অনুমোদনের পর নিয়মিত পরিদর্শনের নথি কোথায়, তা বের করতে হবে। বিতর্কিত অনুমোদনগুলো পুনঃপর্যালোচনা করতে হবে। খাল, পুকুর ও জলাধারসংক্রান্ত পুরোনো অনুমোদনের নিরপেক্ষ অডিট করতে হবে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চট্টগ্রামজুড়ে বিশৃঙ্খলা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close