শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: সমর্থন করে না বললেও হাসিনার পাশেই ভারত      জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা      অপরিকল্পিত নগরায়ণে চট্টগ্রামজুড়ে বিশৃঙ্খলা      ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ভাঙতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে : আইনমন্ত্রী      প্রতিরক্ষা চুক্তির আগে মক্কায় শীর্ষ নেতাদের জুমার নামাজ আদায়      গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত করা যাবে না: অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি      রাজধানীতে রাত একটার মধ্যে হতে পারে বজ্রসহ বৃষ্টি      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সমর্থন করে না বললেও হাসিনার পাশেই ভারত
সফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত ও ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এটিকে সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর বলে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে সেই প্রতিক্রিয়ার পরও ভারত সরকার আগের অবস্থানেই অনড় থেকে জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন ছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, এতে সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যও ভারত সরকার সমর্থন করে না।

কিন্তু এখানেই উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি ভারত সরকার সত্যিই ওই বক্তব্যকে সমর্থন না করে এবং আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকে, তাহলে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একজন বাংলাদেশের দণ্ডিত ও প্রত্যর্পণ-আবেদনের মুখোমুখি ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কীভাবে মিলল? এই প্রশ্নই এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

গত বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ছাত্র আন্দোলন এবং নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাও দেন।

এর আগে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছিল, ভারতের ভূখণ্ড যেন শেখ হাসিনা বা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতে না দেওয়া হয়। কিন্তু সেই অনুরোধের পরও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বুধবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে ভারতের মাটিতে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও তার কার্যকর জবাব এখনো পাওয়া যায়নি।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করছে। তিনি শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানান।

এদিকে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই দিল্লিতে বসে ফ্যাসিস্ট সরকার সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক স্থিরচিত্র প্রদর্শনী শেষে তিনি এ কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দিল্লিতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার ব্রিফিং নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটা প্রেস রিলিজ দিয়ে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করছে। এটাকে বলে বাগাড়ম্বর, চলতি ভাষায় আমরা বলি গলাবাজি।’ তিনি বলেন, ‘প্রেস রিলিজে বক্তব্যে বড় বড় কথা বলতেছেন, কিন্তু আপনি কোনো কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। তারা তো ঘোষণা দিয়েই করেছে এবং দিল্লি সরকার তাদেরকে সহযোগিতা করেছে।’

সরকারের করণীয় সম্পর্কে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘ভারতীয় হাইকমিশনকে ডাকা উচিত ছিল সরকারের। ডেকে কঠোরভাবে এর নিন্দা জানানো উচিত ছিল। পরবর্তীতে এই ধরনের ঘটনায় সরকার কী ব্যবস্থা নেবে, কোন ধরনের কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেবে, এটা জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা উচিত ছিল।’

আগের বক্তব্যই পুনরাবৃত্তি ভারতের: শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন একটি বেসরকারি সংস্থা করেছে, এতে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি আরও বলেন, সেখানে বাংলাদেশের সাংবিধানিকভাবে গঠিত সরকার সম্পর্কিত যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকেও ভারত সরকার সমর্থন করে না।

তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অনেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক। তাদের মতে, ভারতের রাজধানীতে বিদেশি রাষ্ট্রের সাবেক সরকারপ্রধানকে নিয়ে এমন একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমতি, নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ভারতের সরকারি বক্তব্য এবং বাস্তব ঘটনার মধ্যে একটি দৃশ্যমান বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ভারত এই ঘটনায় মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সম্ভবত এটিকে শেখ হাসিনার প্রতি নয়াদিল্লির আরেক দফা রাজনৈতিক প্রশ্রয় হিসেবেই দেখবে। তার মন্তব্য, ভারত চাইলে এই সংবাদ সম্মেলন ঠেকাতে পারত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক শ্রীরাধা দত্তের মতে, দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তখন এই ঘটনা সেই প্রচেষ্টাকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে।

সম্পর্কের সামনে কঠিন বাস্তবতা: বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি পরীক্ষা। একদিকে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে, নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে এবং উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের আপত্তি উপেক্ষা করে একই সময়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় ঢাকায় ভিন্ন বার্তা গেছে।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—ভারত যদি সত্যিই শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন না করে, তবে তাঁকে দিল্লি থেকেই সেই বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কেন দেওয়া হলো? এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো মেলেনি। আর সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক বিতর্ক সহজে থামবে না বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:   হাসিনা   ভারত  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close