দীর্ঘ অপেক্ষার পর যাত্রা শুরু করেছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। তবে উদ্বোধনের শুরুতেই নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় জাদুঘরটি। প্রথম দিন থেকেই সেখানে ছিল সাধারণ মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেই একাধিক দর্শনার্থী অভিযোগ করেন, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত ৫০ টাকা পরিশোধ করলেও তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে শিশুদের জন্য নির্ধারিত ২০ টাকার টিকিট।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করেন তারা। ভিড় ও তাড়াহুড়ার কারণে অনেকেই টিকিটে লেখা মূল্য খেয়াল করেননি। পরে জাদুঘরের ভেতরে গিয়ে টিকিট পরীক্ষা করে দেখেন, ৫০ টাকা দিলেও টিকিটে মূল্য লেখা রয়েছে ২০ টাকা। এরপর একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে আরও কয়েকজন সামনে আসেন।
এক দর্শনার্থী বলেন, ‘আমি ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছি। পরে ভেতরে এসে দেখি, টিকিটে ২০ টাকা লেখা। প্রথমে বিষয়টি খেয়াল করিনি। পরে অন্যদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি, অনেকের সঙ্গেই একই ঘটনা ঘটেছে। যদি ২০ টাকার টিকিটই দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অতিরিক্ত নেওয়া টাকার হিসাব কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।’
আরেক দর্শনার্থীর ভাষ্য, ‘বৃষ্টির মধ্যে তাড়াহুড়ো করে টিকিট নিয়েছিলাম। পরে দেখি, হাতে দেওয়া টিকিটটি শিশুদের জন্য নির্ধারিত ২০ টাকার। অথচ আমার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫০ টাকা। প্রথম দিনেই এমন অভিজ্ঞতা হবে, সেটা ভাবিনি। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।’
এ ধরনের অভিযোগ আরও কয়েকজন দর্শনার্থীও করেন। তাদের দাবি, এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল হলে দ্রুত সংশোধন করা উচিত। আর ইচ্ছাকৃত হয়ে থাকলে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে টিকিট কাউন্টারে দায়িত্বে থাকা এক কর্মচারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা আমার দায়িত্ব না। ওই পাশে যান।’ পরে আরেক কর্মচারীর কাছে একই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘যে অভিযোগ করছে, তাকে নিয়ে আসেন। সিসিটিভি দেখে আমি প্রমাণ করে দেব, কাউকে কম দেওয়া হয়নি।’ তবে এদিন এ ব্যাপারে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এদিকে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর গতকাল ছিল প্রথম শুক্রবার ও প্রথম ছুটির দিন। দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ থাকায় সকাল থেকেই ছিল সরব উপস্থিতি। কিন্তু ছুটির দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে জাদুঘর দেখতে এসে প্রথম দিনেই ভোগান্তিতে পড়েছেন দর্শনার্থীরা। জাদুঘর খোলার সময়সূচি নিয়ে বিভ্রান্তি, অনলাইনে টিকিট কাটা, রিফান্ডের সুযোগ না থাকা এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। একইসঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে একপর্যায়ে স্লোগানও দেন তারা।
সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকেই জাদুঘরের সামনে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে তাদের উপস্থিতি। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন। সকাল ১১টায় জাদুঘর খোলার প্রত্যাশায় এলেও পরে জানতে পারেন, প্রবেশ শুরু হবে বিকাল ৩টা থেকে। এরপর শুরু হয় তাদের অপেক্ষার পালা।
জাদুঘরের মূল ফটকের সামনে ও আশপাশে বসে থাকতে দেখা যায় তাদের। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তপ্ত রোদে ক্ষোভও বাড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পরপর তাদের চিৎকার করতে দেখা যায়। আবার অনলাইনে ভুল তারিখের টিকিট কিনে ক্ষোভ জানিয়েছেন কেউ কেউ। তারা টিকিট রিফান্ডের ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অনেক দর্শনার্থী। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দেন, ‘হই হই রই রই... টিকিটম্যান গেল কই।’
জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা
একজন কর্মী বলেন, ৬ আগস্ট রাতেই নোটিশ টানিয়ে জানানো হয়েছিল, শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘর বিকাল ৩টা থেকে খোলা হবে। তবে অনেকেই আগের সময়সূচি ধরে সকালেই চলে এসেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের ভবনের ধারণক্ষমতা সীমিত। তাই পরিকল্পনা ছিল স্লট পদ্ধতিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করানো। কিন্তু প্রথম সপ্তাহে মানুষের আগ্রহ বেশি থাকায় অনেকেই স্লট পদ্ধতি মানতে চাননি। আমরা এখন একটি পরীক্ষামূলক সময় পার করছি। তাই কিছুটা বেশি মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। তবে পরে শৃঙ্খলিতভাবে প্রবেশ করাতেই হবে। ব্যাগ জমা দিয়ে প্রবেশ, লাইনে দাঁড়ানো, এসব প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগেই। আমার মনে হয়, মানুষও অভ্যস্ত হয়ে যাবে, আমরাও অভ্যস্ত হয়ে যাব। এক সপ্তাহ চলতে দিন। এত বড় একটি জাদুঘর পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাড়লে পুরো প্রক্রিয়া আরও স্মুথ হয়ে যাবে।’
কেকে/এলএ