আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বিলাসী ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের জন্যও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের কথা মাথায় রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশের প্রত্যেক মানুষকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কাউকে বাইরে রাখা হবে না। তাদের সুবিধা-অসুবিধা এবং জীবনযাত্রার মানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।”
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় সবার সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি হতে পারে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যার ৪৮ শতাংশ বৈদেশিক উৎস এবং ৫২ শতাংশ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
সূত্র জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ ও চিকিৎসা খাতে। চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় তৈলবীজ থেকে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের ওপর আগামী ১০ বছরের জন্য শূন্য শতাংশ কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমাতে সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া শিল্প খাতের কাঁচামালের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং আমদানি নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে কিছু পণ্যে কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানি করা কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বিদেশি হিমায়িত মাছের ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন খাতে বিভিন্ন কর ও শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব রয়েছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার ফলে প্রতি সেশনে প্রায় ৬০ টাকা ব্যয় কমতে পারে।
ওষুধ শিল্পের ৬৮টি এবং ক্যানসারের ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত ৯টি কাঁচামালে শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইসঙ্গে হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের করহার ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের কর ছাড় আসছে। মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। নেটওয়ার্ক সেবার উৎসে কর ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বিটিআরসির বিভিন্ন লাইসেন্স ও চার্জের ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশীয় মোবাইল উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২টি কাঁচামালের উৎসে কর ১ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং এ খাতে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে শোধনাগার পর্যায়ে জ্বালানি তেল সরবরাহের উৎসে কর ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ ক্রয়ের উৎসে কর ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩৫ সাল এবং এ খাতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিলের ওপর ৫ শতাংশ কর রেয়াতও বহাল রাখা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন, ই-বাস ও ই-ট্রাক আমদানিতে উৎসে কর শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ির নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আগাম আয়কর সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকায় কমিয়ে আনা এবং ই-বাইক উৎপাদনে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া পরিবহন, ক্যারিং ও গাড়ি ভাড়া সেবার উৎসে কর ২ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতেও বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হচ্ছে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি এবং ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ প্রকল্প। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি একটি বিদেশি ভাষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন ভাষা শেখার জন্য শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাবেন।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি চার লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ও ঋণের ওপর আবগারি শুল্ক মওকুফের প্রস্তাব থাকছে, যা বর্তমানে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রয়েছে। মেট্রোরেল প্রকল্পেও ২০২৮ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখা হচ্ছে।
শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে টেলিভিশন, ফ্রিজ ও কম্পিউটার উৎপাদনে বিদ্যমান কর সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রিন্টার, মনিটর ও ফ্ল্যাশ মেমোরির আগাম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ, এটিএম কার্ডসহ সব ধরনের কার্ড তৈরির কাঁচামালের ওপর ৫ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার এবং ১১৩টি পণ্যের ওপর থেকে ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চ স্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের মূল্য ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফিল্টারের কাঁচামাল, নিকোটিন এবং নিকোটিন পাউচের ওপর উচ্চহারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দেশীয় অ্যালকোহলের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা ভ্যাট এবং বিদেশি প্রসাধনী ও বিলাসী খাদ্যপণ্যের ওপর ২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া স্বর্ণালংকারের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাদ্যযন্ত্র, সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স, ফ্লোট গ্লাস, প্যাকেজিং সামগ্রী এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কর ও শুল্ক কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এমএস রড ও সমজাতীয় লোহার উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর ও ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিড়ির মূল্য ও করহার অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম পরিচালনা করছে।
তিনি জানান, কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য পরিচালিত ‘নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’-এর তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ তহবিলের আওতায় নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ।
উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতকে শক্তিশালী করতে এসব অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, আগামী ১১ জুন বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম এ বাজেটটি পেশ করবেন নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেটটি পাস হলে তা হবে দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট।
কেকে/এলএ