শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিকালে অর্থমন্ত্রীর বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন      ম্যাচে সমতা ফেরালো দক্ষিণ কোরিয়া      দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু মেক্সিকোর      হামের উপসর্গ নিয়ে আর তিন শিশুর মৃত্যু      ইরানে আজ রাতে ‘খুব কঠোর আঘাত’ হানবে যুক্তরাষ্ট্র : ট্রাম্প      অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ      এবার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে পুলিশ মোতায়েন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
হাজারো চা শ্রমিকের হতাশা
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১০:৪৮ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

জুন মাস এলেই জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা-পর্যালোচনা। ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বাজেটের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মতামত দেন। তবে মৌলভীবাজার জেলার ৯২টি চা বাগানের শ্রমিকদের বড় এক অংশের কাছে জাতীয় বাজেট এখনো অনেকটাই অজানা বিষয়। বাজেট কী, কীভাবে প্রণয়ন করা হয় কিংবা এর মাধ্যমে তাদের জীবনে কী প্রভাব পড়ে এসব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই অধিকাংশ চা শ্রমিকের। 

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল সম্পর্কে চা শ্রমিকদের জানাশোনা সীমিত। দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রামই যেন তাদের প্রধান চিন্তার বিষয়।

জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলঞ্জ, রাজনগরসহ বিভিন্ন উপজেলায় চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় বাজেট কী, এতে তাদের জন্য কী বরাদ্দ থাকে কিংবা এভাব তাদের জীবনে কীভাবে পড়ে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই অধিকাংশ শ্রমিকের। চা শ্রমিকদের ভাষায়, বাজেট বুঝি না, কিন্তু এমন বাজেট চাই যাতে আমাদের জীবন-মান একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায়। তবে বাজেট নিয়ে চা শ্রমিকদের মাঝে আলোচনা-সমালোচনা না থাকলেও এই বাজেট কেন্দ্র করেই তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জীবন-মান উন্নয়নের  জোরালো দাবি জানিয়েছেন। 

চা শ্রমিকদের অভিযোগ, দেশ-বিদেশে চায়ের চাহিদা বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে রয়েছে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি। বছরের পর বছর ধরে তারা নানা ধরনের বঞ্চনার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি,  যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আবাসনের মতো মৌলিক সুবিধা অনেক বাগানেই এখনো অপর্যাপ্ত। ফলে জাতীয় বাজেটে তাদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও বরাদ্দের দাবি দীর্ঘদিনের। 

শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন চা বাগানে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রধান চিন্তা জীবিকা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। জাতীয় বাজেট নিয়ে বিশ্লেষণ করার সুযোগ বা বাস্ততা তাদের জীবনে নেই। দৈনিক আয়ের বেশিরভাগ অংশই চলে যায় খাদ্য ও সংসার ব্যয়ে। 

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের শ্রমিক অলকা ভৌমিক বলেন, ‘‘বাজেটের কথা শুনি। কিন্তু আমাদের জীবন-মান উন্নয়নে কোনো প্রভাব দেখি না। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা রোদে পুড়ে কাজ করতে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই জীবিকার জন্য মাঠে নামতে হয়। বাজারে দ্রব্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন।’’ কালিঘাট চা বাগানের সুকেন তাঁতি বলেন, ‘‘বাজেট কখন হয়, কীভাবে হয়, এসব আমরা বুঝি না। আমরা শুধু জানি চা বাগানে কাজ করে যে মজুরি পাই, তা দিয়ে সংসার চালানো খুব কষ্ট। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, মাছ, মাংস- সবকিছুর দাম অনেক বেশি। সরকার এমন ব্যবস্থা করুক যাতে আমরা পরিবার নিয়ে কম খরচে জীবনযাপন করতে পারি।’’

লাখাই চা বাগানের শ্রমিক মেঘলা রাজবংশী বলেন, ‘‘আমাদের থাকার ঘরগুলো অনেক পুরোনো ও জরাজীর্ণ। অনেক পরিবার মানবেতর অবস্থায় বসবাস করছে। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত। আমরা চাই সরকার বাজেটে চা শ্রমিকদের বাসস্থান, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখুক।’’ 

জেরিন চা বাগানের চা বাগানের শ্রমিক প্রতিমা মুন্ডা বলেন, ‘‘প্রতি বছর বাজেটে কোটি কোটি টাকার হিসাব ঘোষণা করা হয়। আমরা টেলিভিশনে দেখি। অথচ আমাদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। আমাদের চিন্তা সপ্তাহ শেষে মজুরি পাব কি না, দুই বেলা খাবার জুটবে কি না।’’

একই বাগানের নারী শ্রমিক অনু ছত্রী বলেন, ‘‘বাজেট কী? সেখানে আমাদের জন্য কী থাকে? এসব আমরা খুব একটা বুঝি না। শুধু শুনি বাজেট ঘোষণা হয়। কিন্তু বাজেট হলেও আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। আমরা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করি। অথচ চাল, চাল, পার, তেলসহ নিত্যাপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে আমাদের মজুরি বাড়ে না। সংসার চালানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।’’

শ্রমিক সোনিয়া রবিদাস বলেন, ‘‘আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ভালোভাবে পড়াশোনা করুক। অসুস্থ হলে যথাযথ চিকিৎসা পাক। গরিব মানুষের জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও বেশি বরাদ্দ এবং কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’’

হাজারো চা শ্রমিকের কণ্ঠে এখনো চরম হতাশা ও বঞ্চনার কথা শোনা যায়। তাদের দাবি, দেশ-বিদেশে চায়ের চাহিদা বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে রয়েছে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি। চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ন্যুনতম ও ন্যায্য মজুরি। কিন্তু বছরের পর বছর শোষণের শিকার তারা। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাড়ে না মজুরি। 

বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, চা বাগান অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির সংকট। অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। জরাজীর্ণ আবাসন এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা চা শ্রমিকদের নিত্যসঙ্গী। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগও সীমিত।
 
স্থানীয় সূত্র জানায়, চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুবিধার সংকট দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময় বিভিন্ন চা বাগানে বকেয়া মজুরি ও রেশন নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষও দেখা গেছে। মৌলভীবাজারের কয়েকটি বাগানে বকেয়া মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন ও কর্মবিরতিও পালন করেছেন। 

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কন্দ বলেন, ‘‘বাজেট কী এবং সেখানে চা শ্রমিকদের জন্য কী বরাদ্দ থাকে, সে সম্পর্কে অধিকাংশ শ্রমিকের কোনো ধারণা নেই। চা শ্রমিকদের নিজস্ব ভিটেমাটি নেই। ভূমির অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। অতীতে আমাদের দাবিগুলো বাজেটে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, জাতীয় বাজেটে চা শ্রমিকদের জন্য আলাদা ও নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হবে। এতে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।’’

চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘‘জাতীয় বাজেটের সুফল চা বাগানের সাধারণ মানুষ খুব একটা পায় না। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে চা জনগোষ্ঠীকে মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অনেক বাগানে এখনো সরকারি স্কুল, হাসপাতাল ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। এসব সমস্যার সমাধানে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ প্রয়োজন।’’ 

চা শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ভূমি মালিকানা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সুপেয় পানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আবাসনের মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিতে জাতীয় বাজেটে তাদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও বরাদ্দের দাবি দীর্ঘদিনের। 

শ্রমিক নেতারা জানান, জাতীয় বাজেটে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, আবাসন উন্নয়ন এবং শিশুদের শিক্ষার জন্য আলাদা বরাদ্দ প্রয়োজন। তবে বাজেট প্রণয়নের সময় তাদের মতামত নেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের চা শিল্প অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান এখনও অনেক পিছিয়ে। কম মজুরি, সীমিত সামাজিক নিরাপত্তা এবং  মৌলিক সেবার ঘাটতির কারণে তারা জাতীয় অর্থনৈতিক নীতির সুফল থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। 

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বাজেট ঘোষণার পর শুধু শহরকেন্দ্রিক আলোচনা নয়, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের মতো পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে বাজেটের তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের চাহিদা প্রতিফলিত করা জরুরি।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  চা শ্রমিকের হতাশা   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close