শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বিরোধীদলের প্রধান কাজ দেশকে অশান্ত করা : প্রধানমন্ত্রী      মউক চেয়ারম্যান হলেন মোতাহার তালুকদার      প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে নতুন বাজেট ঘোষণা পাকিস্তানের      বাবার স্মৃতিবিজড়িত ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      সব নাগরিকের জন্য বাজেট      মালয়েশিয়া-অস্ট্রেলিয়ার আদলে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনা সরকারের      দুই দশক পর কক্সবাজারে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জনমুখী বাজেট
ড. আবদুল গফুর গাজী
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ২:২৩ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট প্রস্তাব বলেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট হিসেবেও এর বিশেষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। গভীর অর্থনৈতিক চাপের এক সময়ে এ বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশ দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, মন্থর প্রবৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতার অবক্ষয়, বিনিয়োগে আস্থাহীনতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মুখোমুখি। ফলে এটি কেবল আয় ও ব্যয়ের প্রচলিত হিসাব নয়; বরং পুনরুদ্ধার, পুনর্বণ্টন, সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের একটি উচ্চাভিলাষী আর্থিক ইশতেহার।

এ বাজেটের সবচেয়ে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হলো এর আকার ও ব্যাপকতা। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত ব্যয় জাতীয় আর্থিক পরিসরের এক নজিরবিহীন সম্প্রসারণকে নির্দেশ করে। তবে বাজেটের গুরুত্ব কেবল তার সংখ্যাগত বিশালতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর নীতিগত দর্শনেও নিহিত। অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মুখেও সরকার শুধু সংকোচনমূলক বা কৃচ্ছ্রসাধননির্ভর পথ গ্রহণ করেনি। বরং জনবিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সহায়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে সম্প্রসারণমূলক আর্থিক অবস্থান গ্রহণ করেছে।

এটি নিছক ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা নয়, বরং একটি সচেতন নীতিগত সিদ্ধান্ত। বেসরকারি বিনিয়োগ যখন সতর্ক অবস্থানে, আর দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিতে ভোক্তা আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত, তখন সরকারি ব্যয় অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব থেকে বোঝা যায়, সরকার বাজেটকে কেবল হিসাবরক্ষার দলিল হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক পুনঃসক্রিয়তার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এই অর্থে, বাজেটটি একটি আর্থিক নথির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিপ্রায়েরও স্পষ্ট ঘোষণা।

এ বাজেটের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক চাপ হয়ে উঠেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়, চিকিৎসা খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনকে ক্রমাগত সংকুচিত করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার সরকারি লক্ষ্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতি ও জনকল্যাণমুখী প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে প্রকাশ করে।

তবে এই দ্বৈত লক্ষ্য যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি চ্যালেঞ্জপূর্ণও। মূল্যস্ফীতি কেবল বাজেটীয় আকাঙ্ক্ষা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলাবদ্ধ মুদ্রানীতি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার তদারকি, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। একইভাবে, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া শুধু সরকারি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি টেকসই করা কঠিন। তাই বাজেট একটি সম্ভাবনাময় কাঠামো দিয়েছে বটে, কিন্তু এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তরের ক্ষমতার ওপর।

বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে প্রবর্তনের উদ্যোগ। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর অধীনে কাজ করছেন, অথচ এই সময়ে মূল্যস্ফীতি তাদের প্রকৃত আয়কে ক্রমাগত ক্ষয় করেছে। সংশোধিত বেতন কাঠামোর প্রাথমিক বাস্তবায়নের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ তাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষকে স্বীকার করে এবং রাষ্ট্রীয় চাকরির মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

পেনশনভোগী ও প্রবীণ অবসরপ্রাপ্তদের প্রতিও বাজেটের দৃষ্টি উল্লেখযোগ্য। পেনশন সুবিধা ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব মূল্যস্ফীতি এবং স্বাস্থ্যব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে স্থির আয়ের মানুষের দুরবস্থার প্রতি মানবিক স্বীকৃতি। সক্রিয় কর্মচারীদের বাইরে অবসরপ্রাপ্তদের প্রতিও সহায়তার পরিসর বিস্তৃত করার মাধ্যমে বাজেট সামাজিক সুরক্ষার একটি বিস্তৃত ও সহানুভূতিশীল ধারণাকে সামনে এনেছে।

কর রেয়াতও এ বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সাধারণ করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব সংখ্যাগতভাবে সীমিত হলেও মূল্যস্ফীতির সময়ে নাগরিকদের জন্য কিছুটা আর্থিক স্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। নারী, প্রবীণ নাগরিক, তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চতর করমুক্ত সীমা প্রস্তাব করব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত, মানবিক ও সামাজিক বাস্তবতাসংবেদী করার ইঙ্গিত দেয়।

নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত টার্নওভার সীমা বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সুযোগ সম্প্রসারণের প্রস্তাব সময়োপযোগী। কারণ নারী নেতৃত্বাধীন ব্যবসা এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা শুধু লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয়বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।

সংস্কারমনস্কতাও এ বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। করব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। কঠিন বাস্তবতাকে এড়িয়ে না গিয়ে বাজেট কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। কর পরিপালন সহজ করা, ডিজিটাল কর প্রশাসন সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে অধিকতর ব্যবসাবান্ধব করার প্রস্তাব অর্থনৈতিক শাসন, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রচেষ্টারই অংশ।

উদীয়মান খাতগুলোর প্রতিও বাজেটের দৃষ্টিভঙ্গি অগ্রসরমান। ফ্রিল্যান্সার, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের জন্য কর সুবিধা এ উপলব্ধির প্রকাশ যে ভবিষ্যতের অর্থনীতি ক্রমেই উদ্ভাবন, ডিজিটাল শ্রম এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভরশীল হবে। এসব খাতকে আর্থিক নীতির আওতায় স্বীকৃতি দিয়ে সরকার ডিজিটাল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূলধারায় আনতে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে।

পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও প্রযুক্তিগত রূপান্তরও বাজেটে স্থান পেয়েছে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর কর কমানোর প্রস্তাব পরিচ্ছন্ন পরিবহনব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য সবুজ অর্থনীতি কোনো অলঙ্কারমূলক ধারণা নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ উন্নয়নকৌশলের অপরিহার্য অংশ। এই খাতে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো আপাতত সীমিত হলেও পরিবেশসচেতন নীতিনির্ধারণের দিকে একটি প্রয়োজনীয় অগ্রসরতা নির্দেশ করে।

তবে বাজেট চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শক্তিশালী কর প্রশাসন, বিস্তৃত করভিত্তি এবং উন্নত কর পরিপালন অপরিহার্য। একই সঙ্গে এত বড় ব্যয় কাঠামো অর্থায়ন করতে গিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা সরকারের সক্ষমতার বড় পরীক্ষা হবে। সর্বোপরি, সংস্কার কর্মসূচির সাফল্য ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতির ওপর নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।

বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য, ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে যাত্রা’, এর বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। ক্রয়ক্ষমতা, সামাজিক সুরক্ষা, সরকারি বেতন সংস্কার, কর রেয়াত, নারীর ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বাজেট নাগরিককে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে স্থাপন করার চেষ্টা করেছে। সমালোচকেরা পৃথক পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা কঠিন যে বাজেটটি তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা উভয়কেই বিবেচনায় নিতে চেয়েছে।

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট কেবল সংখ্যার সম্প্রসারণ নয়; এটি জাতীয় অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের একটি প্রচেষ্টা। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সামাজিক সংবেদনশীলতা, উদ্যোক্তা বিকাশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার একটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে। তবে এই বাজেটের প্রকৃত উত্তরাধিকার নির্ভর করবে উচ্চাভিলাষের ওপর নয়, বরং শৃঙ্খলাপূর্ণ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবায়নের ওপর।

লেখক : প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাজেট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close