গরম বাড়লেই দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে—এটি নতুন কোনো দৃশ্য নয়। কিন্তু প্রতিবছর গরম এলেই যদি মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে: সমস্যাটি কি শুধু বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি?
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের পরিস্থিতি সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। সরকারি তথ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংয়ের চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের নতুন রেকর্ড।
বিদ্যুৎ সংকটের এ চিত্র শুধু অন্ধকার ঘর কিংবা বন্ধ ফ্যানের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উৎপাদন। রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। রংপুরে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, লোডশেডিংয়ের ক্ষতি সব সময় হিসাব করা যায় না। যশোরের অভয়নগরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমের মধ্যে একটি পোলট্রি খামারে চার শতাধিক মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনা তার একটি উদাহরণ। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জেলেদের মাছ সংরক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে। একটি পরিবারের ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়া হয়তো কয়েক ঘণ্টার ভোগান্তি; কিন্তু একজন খামারির শত শত মুরগি মারা যাওয়া কিংবা একজন জেলের মাছ সংরক্ষণ করতে না পারা সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি।
তাহলে এই সংকটের কারণ কী?
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া সংকটের অন্যতম কারণ। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর সঙ্গে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। তবে আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিদ্যুতের দাম বাড়ার পরও সংকট কমেনি। জুনেই পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। অর্থাৎ গ্রাহকের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, কিন্তু তার বিনিময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আরও বেড়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও যদি নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত না হয়, তাহলে সেই বাড়তি খরচের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ কী পাচ্ছে?
এসব কারণ বাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা কি এমন হওয়া উচিত, যেখানে গ্যাস সরবরাহ কমলেই কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হবে? একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকলে তার বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত থাকবে? আর বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের পরিকল্পনাই বা কতটা শক্তিশালী?
এখানেই সমস্যাটিকে শুধু ‘লোডশেডিং’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা আর প্রয়োজনের সময় সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারা এক বিষয় নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি দরকার, বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ দরকার এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের কাছে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা দরকার।
পরিস্থিতির আরেকটি দিক আরও প্রশ্ন তৈরি করে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। অথচ তখন সরবরাহ হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় বিদ্যুৎ না পাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিদ্যমান সক্ষমতারও বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যায়নি। এতে স্পষ্ট হয়, সমস্যাটি শুধু উৎপাদনক্ষমতার ঘাটতি নয়; জ্বালানি, অর্থায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সংকটও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাতে শুধু ‘কত মেগাওয়াট উৎপাদন করা যায়’—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে সেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়?’
এ সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা যেন পড়ছে গ্রামের মানুষের ওপর। ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থার তুলনায় ঢাকার বাইরের গ্রামীণ এলাকায় ঘাটতি অনেক বেশি। নেত্রকোনায় ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে কোনো কোনো সময় সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াটে। নীলফামারীর ডোমারেও প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে—বিদ্যুৎ সংকটের ভার কি সমানভাবে ভাগ হচ্ছে?
আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনিয়মিত লোডশেডিং। বিদ্যুৎ না থাকার কষ্টের সঙ্গে মানুষ কোনোভাবে মানিয়ে নিতে পারে, যদি সে জানে কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন থাকবে না। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি ছাড়াই বারবার বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
আর লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—বিদ্যুৎ না থাকলেও বিদ্যুৎ বিল কি কমছে? অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের পরও মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল প্রত্যাশিত হারে কমছে না; বরং কারও কারও ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বিল আরও বেড়েছে। অবশ্য বিদ্যুৎ বিল শুধু বিদ্যুৎ থাকার সময়ের ওপর নির্ভর করে না। ব্যবহৃত ইউনিট, ইউনিটপ্রতি মূল্য এবং প্রযোজ্য বিভিন্ন চার্জের ভিত্তিতেই বিল নির্ধারিত হয়। তবু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না পাওয়ার পরও বিলের অঙ্ক নিয়ে যখন গ্রাহকের প্রশ্ন ওঠে, তখন বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। একজন কৃষক জানেন না কখন সেচের পাম্প চালাবেন। একজন ব্যবসায়ী জানেন না কখন দোকানের মেশিন চালু করবেন। একজন শিক্ষার্থী জানে না কখন পড়ার টেবিলে আলো জ্বলবে। আর একটি হাসপাতালের ক্ষেত্রে অনিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ঝুঁকি আরও গুরুতর।
তাই লোডশেডিং যদি সাময়িকভাবে এড়ানো সম্ভব না-ও হয়, অন্তত এর ব্যবস্থাপনা হতে পারে আরও মানবিক ও পরিকল্পিত। কোন এলাকায় কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে না, কেন থাকবে না এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগতে পারে—এসব তথ্য মানুষকে জানানো জরুরি।
তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অবশ্যই আরও গভীরে যেতে হবে। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিকল বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত মেরামত করা, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো দরকার। একইসঙ্গে ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনা করে এমন পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে প্রতিবছর গরম এলেই বিদ্যুৎ সংকট নতুন করে জাতীয় দুর্ভোগে পরিণত না হয়। কারণ বিদ্যুৎ এখন আর শুধু আলো, ফ্যান বা টেলিভিশন চালানোর বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, একজন রোগীর চিকিৎসা, একজন কৃষকের সেচ, একজন জেলের মাছ সংরক্ষণ, একজন ব্যবসায়ীর উৎপাদন—সবকিছুর সঙ্গেই বিদ্যুৎ জড়িয়ে আছে।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘বিদ্যুৎ কখন আসবে?’—এখানে থামিয়ে রাখলে চলবে না।
প্রশ্ন হওয়া উচিত, প্রতি বছর গরম এলেই কেন আমাদের আবার একই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়? লোডশেডিংয়ের অন্ধকার হয়তো কয়েক ঘণ্টার জন্য। কিন্তু একটি অনিশ্চিত বিদ্যুৎব্যবস্থার অন্ধকার মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতিতে আরও অনেক দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব ফেলতে পারে।
লেখক: কলামিস্ট
কেকে/এলএ