রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ভয়াবহ নাশকতার ছক আওয়ামী লীগের      একাদশে ভর্তির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ, ভর্তি শুরু রোববার      রাজধানীতে পৃথক স্থানে তিন বাসে আগুন      রাজধানীতে চলন্ত বাসে আগুন      নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি, কার্যকর হবে যেভাবে      বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জঙ্গল থেকে কুবি শিক্ষিকার নিখোঁজ ছেলের লাশ উদ্ধার      ঢাকায় নিরাপত্তা জোরদার, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫১৫      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের প্রস্তাবনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির হাত ধরেই বদলাবে রাষ্ট্র, কিন্তু কীভাবে?
প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:১৫ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের আগামী বিপ্লবটি হয়তো রাজপথে হবে না, হবে তথ্যের ডিসপ্লেতে। পর্দার অন্তরালে নয়, বরং পর্দায়। যে রাষ্ট্র তার তথ্যকে শক্তিতে রূপ দিতে পারবে, যে সরকার তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং যে দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের বিকল্প নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে, আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন শুধু ‘ডিজিটাল’ হওয়ার মধ্যে থেমে না থেকে প্রশ্ন হলো, আমরা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আরও দক্ষ, আরও সুদৃঢ়, আরও উৎপাদনশীল এবং আরও জনকল্যাণমুখী ও জনবান্ধব একটি পরিবর্তিত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারব? আর এই বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবে সততা ও প্রযুক্তি, আর প্রযুক্তির কেন্দ্রে থাকবে মানুষ ও মানুষের চাহিদা।

বাংলাদেশের প্রযুক্তির যাত্রা এখন আর শুধু কম্পিউটার, ইন্টারনেট কিংবা কিছু সরকারি সেবা অনলাইনে নিয়ে আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যাংকিং, ব্যবসা, নিরাপত্তা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে আজকের প্রশ্নটি শুধু আমরা কতগুলো ডিজিটাল সেবা তৈরি করেছি, তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তিকে আমরা কীভাবে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়াতে, মানুষের জীবন সহজ করতে এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যবহার করতে পারি।

এই জায়গাতেই জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম বা এনআইসিটিএফের মতো একটি পেশাজীবী ও প্রযুক্তিবিদদের প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব তৈরি হয়। তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং প্রযুক্তি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যা রাষ্ট্র ও সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগকে যুক্ত করতে পারে। আর এই প্ল্যাটফর্মের কাজ কেবল প্রযুক্তির কথা বলা নয়; বরং কোথায় প্রযুক্তি প্রয়োজন, কীভাবে তা প্রয়োগ করা যায়, কতটা ফল পাওয়া গেল এবং সাধারণ মানুষ তার সুফল পেল কি না—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর খোঁজা।

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, আত্মনির্ভরতা, উৎপাদনশীলতা এবং মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচিতে উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির যে গুরুত্ব ছিল, বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি সেই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০-এ যে আধুনিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের ধারণা সামনে এসেছে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সেই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে। ২০২৬ সালের বিএনপির ইশতেহারেও ৩১ দফার আলোকে এই ধারার সঙ্গে বর্তমান রাষ্ট্র সংস্কার ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে যুক্ত করা হয়েছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষেত্রেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক কর্মধারা ও কর্মসূচিতে প্রযুক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, ভবিষ্যৎমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সেবার উন্নতির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।

এই বাস্তবতায় জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম কাজ করে যাচ্ছে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দেশি-বিদেশি প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি কার্যকর সেতু তৈরির ব্রত নিয়ে। বিশ্বজুড়ে অনন্য রাষ্ট্রগুলো যা ভালো করছে, সেগুলোর সমন্বয় করে এবং সরকারের নীতির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে রাষ্ট্রের বৃহত্তর লক্ষ্য নির্ধারণে আজ জাতীয়তাবাদী আইসিটি প্রযুক্তিবিদদের দায়িত্ব হয়ে উঠছে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবসম্মত প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করা।

আসুন, এই বিষয়ে একটু বিশ্লেষণে যাই। আমি মনে করি, শিক্ষাক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। শুধু বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার দেওয়া কিংবা অনলাইনে ক্লাস চালু করলেই শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি, দক্ষতা, আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করা এবং দেশের জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার, তা বাস্তবায়ন সম্ভব।

ইন্ডাস্ট্রিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নতুন নতুন সমাধানের শিক্ষা প্রয়োজন সবার আগে। তাছাড়া শিক্ষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কোথায় পিছিয়ে আছে, কোন বিষয়ে তার আগ্রহ বেশি এবং ভবিষ্যতে চাকরি বা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কোন ধরনের দক্ষতা তার প্রয়োজন হতে পারে—দেশের বাইরে প্রতিযোগিতামূলক এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদের আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা সম্ভব। আরও অনেক বিষয় আছে এখানে বলার মতো, অন্য সময় লিখব।

যাহোক, স্বাস্থ্য খাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু হাসপাতালের যন্ত্রপাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। একজন রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল, ওষুধ ব্যবহারের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য-তথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষিত থাকলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রোঅ্যাকটিভ (Proactive) চিকিৎসাব্যবস্থায় আমাদের ঢুকতে হবেই এবং তা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার এখনই শুরু করা খুব দরকার। সেই সঙ্গে দূরবর্তী চিকিৎসাসেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্য-তথ্য ব্যবস্থাপনা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্যও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে পারবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি। কৃষককে শুধু কৃষি-পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপস (Apps)-এর মাধ্যমে আবহাওয়া, মাটির অবস্থা, রোগবালাই, বাজারদর এবং উৎপাদনের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সময়মতো পরামর্শ দেওয়া সম্ভব। একজন কৃষক যদি সরকারি সহায়তায় ক্রয়কৃত তার মোবাইল ফোনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপসের মাধ্যমে জানতে পারেন কখন বীজ বপন করা ভালো, কখন সেচ দেওয়া প্রয়োজন, কোন রোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং কোন বাজারে তার পণ্যের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে প্রযুক্তি সত্যিকার অর্থেই তার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপস নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। সরকারি সহায়তায় ঘরে বসে কাজ, অনলাইন ব্যবসা, দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ—এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক নারী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিকে তাই শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, নারীর সমাজে সমঅংশগ্রহণ, আয় ও কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবেও দেখতে হবে।

বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবস্থাপনাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বিশাল তথ্যভান্ডার তৈরি ও তা ব্যবহার করে কোথায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি, কোথায় বিদ্যুৎ বা এমনকি পানি অপচয় হচ্ছে, কোথায় সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে—এসব তথ্য যদি তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়, তাহলে দ্রুত জনকল্যাণে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তাই এই ক্ষেত্রে আমি মনে করি, ভবিষ্যতের রাষ্ট্রে বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন, সহজে ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ, স্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন এবং প্রান্তিক মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—সবকিছুর সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এগুলো একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে, যা দেশের উৎপাদন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পরিবহন ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহারও এখন সময়ের দাবি, যার সুফল দেশ নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনায় পাওয়া শুরু করেছে। যানজট কোথায় তৈরি হচ্ছে, কোন সড়কে অতিরিক্ত চাপ রয়েছে, কোথায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে যানবাহন চলাচল আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থা শুধু রাস্তা ও গাড়ির ওপর নির্ভর করবে না; তথ্যও সেখানে স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠবে।

ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা যাতে বিশ্বের বাজারে সরাসরি প্রবেশ করতে পারেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে তথ্য পান এবং বাংলাদেশি পণ্য ও সেবা যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়, সে জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল বাণিজ্য পরিবেশ প্রয়োজন। একই সঙ্গে কূটনীতিতেও তথ্য বিশ্লেষণ, বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির জ্ঞান, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।

তবে সরকারকে বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ ও সরকারি অবকাঠামো—সবকিছু এখন ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তাই এখন প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়। এই আধুনিক সমাজে এটি জাতীয় নিরাপত্তারই একটি অংশ। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন আইন ও কাঠামো নিয়ে কাজ করছে। জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের প্রস্তাবনা হচ্ছে, এখানে দেশের এবং বিদেশের বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির গবেষকদের সম্পৃক্ত করা দরকার।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে আমরা অনেক ক্ষেত্রে ‘ডিজিটাল সরকার’ নিয়ে কথা বলি। কিন্তু ভবিষ্যতের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সরকারব্যবস্থা, যেখানে তথ্য শুধু সংরক্ষিত হবে না, বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ব্যবহার করা হবে। একটি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অন্য মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হবে, নাগরিককে একই তথ্য বারবার জমা দিতে হবে না এবং সরকারি সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক হবে। আর এই ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার খুব দরকার।

তাই বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে একটি শক্তিশালী জাতীয় তথ্যব্যবস্থা। নাগরিকের প্রয়োজনীয় তথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষণ, বিভিন্ন সরকারি সেবার মধ্যে সমন্বয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড মেনে এটা করতে হবে। তবে এর সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নাগরিকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির উদ্দেশ্য কখনোই মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো নয়; বরং মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা।

এখানে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে প্রত্যয় নিয়ে সামনে যাচ্ছে। ফোরামটি সরকারের সহায়ক প্ল্যাটফর্ম হয়ে না থেকে বরং প্রযুক্তিবিদদের জ্ঞান, গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সরকারের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। দেশের বিভিন্ন খাতের তথ্য ও বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিগত সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের প্রস্তাব তৈরি, প্রয়োজনীয় গবেষণা করা, তরুণ প্রযুক্তিবিদদের যুক্ত করা, দেশি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা—এসব হতে পারে ফোরামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা খরচ হয়েছে বা কতটি বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। দেখতে হবে মানুষের সময় কতটা বাঁচল, সরকারি সেবার মান বাড়ল বা খরচ কতটা কমল, কৃষকের উৎপাদন কতটা বাড়ল, শিক্ষার্থীর দক্ষতা কতটা উন্নত হলো, চিকিৎসা কতটা সহজ হলো, ব্যবসার সময় ও খরচ কতটা কমল এবং নতুন কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো। অর্থাৎ প্রযুক্তির আসল মূল্যায়ন হবে মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশের দূরদর্শী চিন্তা আজ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর। তাঁর সেই স্বনির্ভরতার দর্শনকে আজকের ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়া সম্ভব। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের যুগান্তকারী ধারণা আজ ব্লকচেইন ও বিগ ডাটার মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল হয়েছে, যা সুশাসন নিশ্চিত করতে এক অনন্য অস্ত্র। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৩১ দফা বাস্তবায়নে প্রযুক্তিনির্ভর, বিনিয়োগমুখী ও ভবিষ্যৎমুখী রাষ্ট্র গঠনের ঘোষিত লক্ষ্য আজ বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। তাঁর এই আধুনিক রূপকল্প ২০২৬ সালের সরকারি অগ্রাধিকারের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যায়, যেখানে মূল লক্ষ্যই হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একটি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

কিন্তু এগুলো হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এবং গণমানুষের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। জিয়া পরিবারের এই তিন প্রজন্মের ধারাবাহিক বীরোচিত নেতৃত্ব গণমানুষের চিন্তাধারার সঙ্গে পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত। জিয়া পরিবারের এই তিন প্রজন্মের ধারাবাহিক বীরোচিত নেতৃত্ব ও চিন্তাধারা প্রমাণ করে যে, তাঁরা সব সময়ই যুগের প্রয়োজনীয় দর্শন অনুসরণ করে গণমানুষের কথা হৃদয়ে ধারণ করেছেন।

যাহোক, সবশেষে বলতে চাই, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, পরিবহন, বিদ্যুৎ, পানি, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা—প্রতিটি খাতের মূল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে যুক্ত করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার বাইরে গিয়ে আরও কার্যকর, তথ্যভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ক্ষেত্রভান্ডার ও গণমানুষের জন্য সহজ রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা। যেখানে তথ্য হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হবে বিশ্লেষণের সহায়ক, প্রযুক্তি হবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর হাতিয়ার এবং রাষ্ট্রীয় সেবার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানুষ।

শহীদ জিয়ার স্বনির্ভরতার স্বপ্ন, বেগম খালেদা জিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং তারেক রহমানের মানবসম্পদ উন্নয়নমুখী ও বৈশ্বিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনই আজ বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার মূল চালিকাশক্তি। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে বাস্তবে রূপ দিতে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের সামনে এক বিরাট ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ব কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগানকে প্রযুক্তির ভাষায় পুনরাবৃত্তি করা নয়। বরং জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যকে বাস্তব প্রযুক্তিগত কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া, সরকারের নীতি ও লক্ষ্যকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা। এ ক্ষেত্রে বিদেশের ও দেশের প্রযুক্তিবিদদের মেধা এবং অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রের কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের সামনে এখন প্রযুক্তির একটি নতুন অধ্যায় খুলছে। এই অধ্যায়ে সফলতা নির্ভর করবে আমরা কত দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তার ওপর। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা এবং দেশীয় মেধার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রযুক্তির শেষ লক্ষ্য প্রযুক্তি নিজে বা ব্যক্তিগত কাজে নয়; এর শেষ লক্ষ্য হলো গণমানুষের জীবন সহজ করা, রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর করা এবং অর্থনীতিকে আরও উৎপাদনশীল করা। যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বনির্ভর, সক্ষম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র তৈরি করবে।

লেখক: প্রফেসর অফ বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহির্বিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close