খুলনার দাকোপ কিংবা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কোনো একটি গ্রামের দৃশ্য কল্পনা করা যাক। গনগনে রোদের ভেতর কলস কাঁখে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন একদল নারী। তাদের গন্তব্য এমন একটি পুকুর বা ফিল্টার, যেখানে একটু মিষ্টি পানি মিলতে পারে। একসময় এই জনপদে মিষ্টি পানির এত হাহাকার ছিল না। বাড়ির পাশের পুকুর বা নলকূপেই অনায়াসে মিলত তৃষ্ণা মেটানোর জল। চারপাশের শিবসা, পশুর কিংবা কপোতাক্ষ নদের পানিতে এখন গিজগিজ করছে লবণ। খাবার পানিতে লবণের এই আগ্রাসন মানুষের তৃষ্ণাই বাড়িয়ে দিচ্ছে না, ক্রমশ ধ্বংস করে দিচ্ছে উপকূলের জনস্বাস্থ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বারবার আছড়ে পড়া ঘূর্ণিঝড় উপকূলের মিষ্টি পানির আধারগুলোকে পুরোপুরি বিষিয়ে তুলেছে। আইলা, আম্পান বা রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো চলে যাওয়ার পরও জমিতে রেখে যায় লবণের স্থায়ী ক্ষত। লবণাক্ততা এখন স্বাস্থ্য ও বৈষম্যের এক গভীর কাঠামোগত রূপ নিয়েছে।
উপকূলের মানুষ এমনিতেই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে। কৃষিজমিতে লবণ পানি ঢুকে ফসল উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ঘরের পুরুষেরা কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান শহরের ইটভাটায় কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে যান গভীর সমুদ্রে। বাড়িতে থাকা নারীদের দিন কাটে চরম উৎকণ্ঠায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবিকা হারানোর ভয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে গবাদিপশু মরে যাওয়া আর আয় কমে যাওয়ার দীর্ঘস্থায়ী চাপ।
সম্প্রতি স্প্রিঙ্গার নেচার জার্নালে প্রকাশিত আইসিডিডিআর,বি এবং নিপোর্টের একটি গবেষণা উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যের এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি লবণাক্ত পানিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ। গবেষণায় অংশ নেওয়া চার হাজারেরও বেশি নারীর প্রায় ৭৫ শতাংশই মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার মানসিক চাপে রয়েছেন। পরিবেশগত অনিশ্চয়তা কোনো এককালীন দুর্যোগ নয়। এটি বারবার ফিরে এসে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তৈরি করে, যা স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। মানসিক এই চাপ এবং অনিচ্ছাকৃত সোডিয়াম গ্রহণ মিলে নারীদের শরীরে নীরবে তৈরি করছে উচ্চ রক্তচাপের মতো মরণঘাতী রোগ।
উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি দীর্ঘদিন পান করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই লবণাক্ত পানি সরাসরি কোনো রোগ না ঘটালেও এটি মারাত্মক সব স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। আইসিডিডিআর,বি-এর ওই গবেষণা বলছে, উপকূলের প্রায় ২৫ শতাংশ নারী উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। খাওয়ার পানিতে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম বাড়লে উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা অন্তত ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। আর যে নারীরা একইসঙ্গে উচ্চমাত্রার লবণাক্ত পানি পান করছেন এবং তীব্র মানসিক চাপে ভুগছেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে প্রায় আড়াই গুণ বেশি। গ্রামের পর গ্রাম সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারছেন না কেন হঠাৎ করে তাদের রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। ঘাড় ব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গগুলোকে তারা সাধারণ দুর্বলতা বলে এড়িয়ে যান। সুপেয় পানির অভাবেই তাদের শরীরে বাসা বাঁধছে এই নীরব ঘাতক। অথচ তা জানার বা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার কোনো সুযোগ প্রান্তিক এই মানুষগুলোর নেই।
লবণাক্ততার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন উপকূলের নারীরা। গর্ভাবস্থায় উচ্চমাত্রার লবণযুক্ত পানি পানের কারণে নারীদের প্রি-এক্লাম্পশিয়া এবং জেস্টেশনাল হাইপারটেনশনের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে গবেষকরা সতর্ক করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই এটি মাতৃমৃত্যু এবং অকাল গর্ভপাতের মতো মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মাতৃত্বের পাশাপাশি নারীদের দৈনন্দিন প্রজনন স্বাস্থ্য এবং ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতাও আজ চরম হুমকির মুখে। সুপেয় পানির অভাবে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত ও দূষিত পানিতেই স্যানিটারি কাপড় ধুতে হচ্ছে তাদের। এর ফলে জরায়ুর সংক্রমণসহ নানা জটিল স্ত্রীরোগে ভুগছেন হাজারো নারী। সুচিকিৎসার অভাবে বাধ্য হয়ে অনেক নারী অল্প বয়সেই জরায়ু কেটে ফেলার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এটি একটি জনগোষ্ঠীর জন্য চরম ট্র্যাজেডি।
লবণ-পানির এই আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বয়স্কদের চেয়ে অনেক কম থাকে। প্রতিদিনের গোসল আর পানের পানিতে লবণের আধিক্য শিশুদের ত্বকে মারাত্মক চর্মরোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় এবং পানিবাহিত অন্যান্য রোগের প্রকোপ উপকূলীয় এলাকায় লেগেই থাকে। বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। লোনা পানির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে শাকসবজি ও দেশি ফলের উৎপাদনও মারাত্মকভাবে কমে গেছে। উঠানের লাউ-কুমড়োর মাচাগুলো আজ প্রায় শূন্য। ফলের গাছগুলোও মরে যাচ্ছে। ফলে শিশুদের পুষ্টির স্বাভাবিক উৎসগুলোও একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
লবণাক্ততার এই সংকট কোনোভাবেই সবার জন্য সমান নয়। এটি মূলত দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক কাঠামোগত বৈষম্য। খাদ্যে লবণের পরিমাণ মানুষ চাইলেই কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পানির মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ সোডিয়াম শরীরে ঢুকছে, তা পুরোপুরি পরিবেশগত। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা নিয়মিত বোতলজাত পানি কিনছেন। অথবা গভীর নলকূপ ও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার আধুনিক ব্যবস্থা করছেন। দরিদ্র পরিবারগুলোর সেই উপায় নেই। সুপেয় পানির জন্য দীর্ঘ হাঁটা নারীদের শ্রমঘণ্টা কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের শারীরিক সুস্থতা নষ্ট করছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি আর অর্থনৈতিক দুর্দশা মিলে দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর এক অসামঞ্জস্যপূর্ণ বোঝা চেপে বসছে। অভিযোজনের নামে যেসব প্রকল্প আসে, তার সুফলও অনেক সময় এই হতদরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় উচ্চ রক্তচাপের গতানুগতিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তাও যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং কমিউনিটি ভিত্তিক পানি শোধনাগার গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। উপকূলীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মানসিক কাউনসিলর নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যত বাড়বে, লবণাক্ততার এই আগ্রাসন তত বেশি, দেশের ভেতরের দিকে প্রবেশ করবে। সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে এবং উপকূলের স্বাস্থ্যকাঠামো শক্তিশালী করতে না পারলে জলবায়ু ন্যায়বিচারের আলাপ ফাঁকা বুলি হয়েই থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঐতিহাসিক দায় উন্নত বিশ্বের। অথচ এর চরম মূল্য আজও চুকিয়ে যাচ্ছে আমাদের উপকূলের প্রান্তিক মানুষ।
লেখক : প্রতিবেশ গবেষক
কেকে/ এমএস