মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: চাঁদপুরে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫      বিএনপির পরিকল্পনা-কর্মসূচি সবসময়ই জনবান্ধব : প্রধানমন্ত্রী      প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী      হাসিনা ও হাদি হত্যাকারীদের ফেরাতে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের অনুরোধ      প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক      শহর-গ্রামে ডেঙ্গুর ভয়      চমক আসছে মন্ত্রিসভায়      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মক্কা চুক্তি : বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি
ফরহাদ নাইয়া
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

গত ৭ আগস্ট  মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার আওতায় তিন দেশের যে কোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে বাকি দুই দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট নামে পরিচিত এ চুক্তিতে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ন্যাটোর সেই বিখ্যাত ধারা পাঁচের অনুরূপ এ সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার মুসলিম বিশ্বের তিনটি সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিকে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছে, যদিও যৌথ বিবৃতিতে সুনির্দিষ্ট সামরিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি এখনো অনেকটাই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে।

এ চুক্তি হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইরানকেন্দ্রিক বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেই এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, যে যুদ্ধে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী এ যুদ্ধ গোটা আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোকেই নাড়িয়ে দিয়েছে সরাসরি হামলা পৌঁছে গেছে সৌদি ভূখণ্ডেও, আর হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। জ্বালানি ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তার আঘাত লেগেছে, আর পাকিস্তান-তুরস্কের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো এ ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছে।

তবে এ চুক্তি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার ফসল। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিয়াদের আল-ইয়ামামাহ প্রাসাদে সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ) স্বাক্ষর করেছিল, যার আওতায় প্রায় আট হাজার পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়েছিল। মক্কা চুক্তি মূলত সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তুরস্ককেও একই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করল।

বিশ্লেষকদের মতে, এ জোটের বিশেষত্ব হলো, তিন দেশের সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী শক্তির মেলবন্ধন। সৌদি আরব দিচ্ছে বিপুল আর্থিক সামর্থ্য ও জ্বালানি বাজারে আধিপত্য, তুরস্ক দিচ্ছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা বিশেষত মনুষ্যবিহীন আকাশযান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও নির্ভুল-নিশানা অস্ত্রের ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা উল্লেখযোগ্য আর পাকিস্তান দিচ্ছে যুদ্ধ-পরীক্ষিত বিশাল স্থলবাহিনী এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক প্রতিরোধশক্তি। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষকরা একে অভিহিত করেছেন উদীয়মান বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে।

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি এ চুক্তিকে অভিহিত করেছেন এক উদীয়মান আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থাপত্যের প্রথম কংক্রিট ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে। তার মতে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ফিলিস্তিন সমস্যার মতো দীর্ঘদিনের সংকটও আঞ্চলিকভাবে চালিত পদ্ধতিতে সমাধানের পথ খুলে যেতে পারে।

পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে এ চুক্তি নিছক ভূরাজনীতি নয়, এটি দেশটির অর্থনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় পাকিস্তান নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছিল। জুন মাসে ইসলামাবাদ মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং তৈরিতে সহায়তা করে সাময়িকভাবে আঞ্চলিক সংঘাত থামাতে ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তান, কিন্তু পরবর্তী উত্তেজনা বৃদ্ধি তার সেই নিরপেক্ষ অবস্থানকে সংকুচিত করে ফেলে। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব সংকটে জর্জরিত একটি সরকারের জন্য কৌশলগত প্রতিরক্ষা নীতি এখন আর্থিক প্রয়োজনীয়তা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তান তার সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করেছে অর্থনৈতিক সহায়তা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের কাছ থেকে। এ সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামো সেই পুরোনো মডেলকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে যৌথ প্রশিক্ষণ, সেনা মোতায়েন থেকে শুরু করে অস্ত্র রপ্তানি পর্যন্ত নিজের কার্যকরী সক্ষমতাকে পুঁজি করে ইসলামাবাদ বিনিময়ে পাচ্ছে উপসাগরীয় বিনিয়োগ, জ্বালানি ছাড় ও কূটনৈতিক সমর্থন। এক পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন যে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি এখন কৌশলগত পুঁজির পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুঁজিতেও রূপান্তরিত হচ্ছে।

তবে এ চুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিও। ইরান দ্রুত এবং কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের সদস্য এব্রাহিম রেজায়ি এই চুক্তিকে অগ্রাহ্য করে মন্তব্য করেছেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগুজে চুক্তি সৌদি আরবকে প্রকৃত নিরাপত্তা দেবে না। এ প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানের একটি মৌলিক দ্বিধা সামনে নিয়ে আসে উপসাগরীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোয় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের চিরাচরিত সতর্ক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে।

বিশ্লেষকরা এখানে ‘এনট্র্যা পমেন্ট’ বা ফাঁদে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা বলছেন এমন এক পরিস্থিতির ঝুঁকি, যেখানে পাকিস্তান এমন বিদেশি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াইয়ে সরাসরি জড়ানো এড়িয়ে চলেছে ২০১৫ সালে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উদ্বেগের কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন কোয়ালিশনে যোগ দিতে পার্লামেন্ট অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। পাকিস্তানে একটি বড় শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অনেকে ইরানি ধর্মীয় নেতৃত্বকে রাজনৈতিক-ধর্মীয় দিকনির্দেশক মনে করেন। ফলে সৌদি-তুর্কি ঘনিষ্ঠতা যেন অভ্যন্তরীণভাবে ইরানবিরোধী অবস্থান হিসেবে বিবেচিত না হয়, সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে না দেয়- সেটি নিশ্চিত করাও ইসলামাবাদের জন্য জরুরি।

ইসরায়েল ও ভারতের দুশ্চিন্তা

এই সম্ভাব্য ‘মুসলিম নিরাপত্তা জোট’ ইসরায়েলেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট আগেই সতর্ক করেছিলেন যে তুরস্ক পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলার মতো এক শত্রুভাবাপন্ন অক্ষ গড়ে তুলতে চাইছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের পারমাণবিক মর্যাদা এ চুক্তির কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে অনিবার্যভাবে বদলে দেয়।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এই চুক্তির প্রভাব বিস্তৃত। পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভারতের বিপরীতে একটি কৌশলগত প্রতিভারসাম্য তৈরি করতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্কতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তবে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ নিয়ে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব কানওয়াল সিবাল এ চুক্তিকে ভারতীয় স্বার্থের জন্য একটি অত্যন্ত নেতিবাচক ঘটনা বলে অভিহিত করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল, গ্রিস, সাইপ্রাস ও আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত বিকল্প সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন

মক্কা চুক্তি আপাতত একটি কাঠামোগত অঙ্গীকার হলেও এর প্রকৃত পরীক্ষা হবে বাস্তব সংকটের মুহূর্তে। অবসরপ্রাপ্ত এক পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদের ভাষায়, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর প্রকৃত ও সম্মিলিত শক্তি কেবল সামরিক সক্ষমতা থেকে আসবে না, বরং আসবে জ্ঞান, উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা এবং সাম্প্রদায়িক সহনশীলতার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে। এ চুক্তি অতিরিক্ত মুসলিম রাষ্ট্রকেও ভবিষ্যতে যুক্ত করতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন, যদিও তা কতটা বাস্তবায়িত হবে তা নির্ভর করছে আঞ্চলিক পরিস্থিতির আরও বিবর্তনের ওপর। সব মিলিয়ে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল তিনটি দেশের নিরাপত্তা অঙ্গীকার নয় এটি এক পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার প্রতিফলন, যেখানে ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর আস্থা কমছে, আর মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিগুলো নিজেদের নিরাপত্তার লাগাম নিজেদের হাতে তুলে নিতে চাইছে।

লেখক : কবি ও গণমাধ্যম কর্মী

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close