দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ জলরাশির টাঙ্গুয়ার হাওর ও তার তীরবর্তী জনপদ শুধু প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের ভূখণ্ড নয়; এটি ইতিহাস, কৃষি, সংস্কৃতি ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যেরও এক জীবন্ত ভূগোল। বাঙালিদের বসতি গড়ে ওঠার বহু শতাব্দী আগে থেকেই এ অঞ্চলে বসবাস করে আসছে গারো, হাজং ও বানাই—এ তিন আদিবাসী জনজাতি। পরবর্তী সময়ে বাঙালিদের আগমনের সঙ্গে তাদের জীবন, ভাষা, কৃষি, সংস্কৃতি ও লোকজ জ্ঞানের মিথস্ক্রিয়ায় হাওরের জল-জীবন-প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এক অনন্য সহাবস্থান। বহু বৈচিত্র্যের মধ্যেও এই সহাবস্থানই ছিল এ অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতির অন্যতম শক্তি।
কিন্তু সময়ের নির্মম অভিঘাতে সেই সহাবস্থানের ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ভূমি-রাজনীতি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কাঠামোগত বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের চাপে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর জীবন থেকে একে একে সরে যাচ্ছে তাদের ভূমি, ভাষা ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা।
সুনামগঞ্জের হাওর ও ওপারের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সন্ধিস্থলে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর সংকট তাই শুধু দারিদ্র্য বা অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার সংকট নয়। এটি ভূমি হারানোর সংকট, মাতৃভাষা হারানোর সংকট, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হারানোর সংকট এবং শেষ পর্যন্ত নিজ ভূখণ্ডেই ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সংকট।
রাষ্ট্রীয় নীতিতে আমরা প্রায়ই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’-এর কথা বলি। কিন্তু বাস্তবতার প্রশ্ন হলো—উন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন, ইতিহাস ও অধিকার কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়? অথচ গারো, হাজং ও বানাই জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ভূখণ্ডের কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে বেঁচে থাকার যে জ্ঞান তারা উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করেছে, তা শুধু একটি জনগোষ্ঠীর সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের লোকজ জ্ঞানভান্ডারেরও অংশ।
কোন জমিতে কোন জাতের ধান ভালো হয়, কখন পানি নামবে, কোন সময়ে মাছের প্রজনন ঘটে, জলাভূমির কোন পরিবর্তন কী সংকেত দেয়—এমন অসংখ্য অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান তাদের জীবনযাপনের অংশ ছিল। অথচ আধুনিক উন্নয়ন কাঠামো অনেক সময় সেই জ্ঞানকে মূল্যায়নের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় বা সেকেলে বলে পাশ কাটিয়েছে। ভূমির অধিকার হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই কৃষিজ্ঞান, লোকসংস্কৃতি ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শনও।
হাওরাঞ্চলের আদিবাসীদের সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো—এই অঞ্চলের তিন আদিবাসী জনজাতির মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র বানাই জনগোষ্ঠী আজ অস্তিত্বের গভীর সংকটে। প্রশ্নটি তাই এখন আর শুধু তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের নয়; প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বানাই নামে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা আদৌ টিকে থাকবে কি না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, একসময় এই দেশ, এমনকি বৃহত্তর হাওরাঞ্চলেও বানাইদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু ১৯৪৭-এর দেশভাগ, টংক আন্দোলন, জমিদারি উচ্ছেদ, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা, ভূমি হারানো, বহিরাগত জনসংখ্যার চাপ এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার অভিঘাতে এখানকার অনেক আদিবাসী পরিবার দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। সংকুচিত হতে থাকে তাদের বসতি ও কৃষিজমি।
এ সংকটের সবচেয়ে সামনের সারিতে পড়ে বানাইরা। তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র জনসংখ্যা, সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব তাদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ভূমি হারানো, সামাজিক বৈষম্য এবং বহুমুখী চাপের কারণে অনেকে সীমান্তের ওপারে পাহাড়ি এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দেশত্যাগের ধারাবাহিকতায় কমেছে জনসংখ্যা; আর জনসংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়েছে ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার সামাজিক ভিত্তিও।
যারা এখনো ভিটেমাটি আঁকড়ে আছেন, সংখ্যায় তারা অতি নগণ্য। তবু নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু দেশত্যাগের প্রবণতা যে থেমে গেছে, তা বলা যায় না।
ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে গত সাড়ে চার বছর ধরে দুই-তিনজন বানাই বন্ধুর সহযোগিতায় বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। সেই পর্যবেক্ষণে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। গত চার বছরে অন্তত ১৭ জন বানাই যুবক দেশত্যাগ করে ভারতে স্থায়ীভাবে চলে গেছেন। আরও কয়েকজনের সীমান্তের ওপারে অনিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। সংখ্যাটি হয়তো জাতীয় পরিসংখ্যানে খুব বড় নয়। কিন্তু ৩০৪ জনের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ১৭ জনের স্থায়ী দেশত্যাগ মোট জনসংখ্যার ওপর কী ধরনের অভিঘাত ফেলতে পারে, তা বুঝতে খুব বেশি হিসাবের প্রয়োজন হয় না।
পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে—বাংলাদেশে বানাই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আসলে কত?
২০২২ সালের জনশুমারিতে মধ্যনগর উপজেলার আদিবাসীদের জন্য পৃথক ও নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজ না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে জনশুমারির তথ্য সংগ্রহে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে এবং স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী দলের সহযোগিতায় পৃথক তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ‘জাতীয় বানাই ছাত্রকল্যাণ পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় সদস্য ও জরিপ দলের নেতা ধ্রুব রাজ বানাইয়ের ২০২২ সালে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার মোহনপুর ও বহেরাতলী—এ দুই গ্রামে বানাইদের বসবাস। সেখানে ৬৩টি পরিবারে মোট ২৭৬ জনের বসবাসের তথ্য পাওয়া যায়। নেত্রকোনার বালুচড়া গ্রামে পাঁচটি পরিবার এবং ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার গানই গ্রামে আরও দুটি পরিবারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ২০২২ সালে দেশে বানাই জনজাতির মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০৪ জন। এরপর দেশত্যাগের কারণে সংখ্যাটি আরও কমেছে।
এ পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা সংখ্যার আকারে নয়, অনুপাতের মধ্যে। কয়েকশ মানুষের একটি জাতিসত্তা যখন ক্রমাগত ছোট হতে থাকে, তখন তার প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষ এবং প্রতিটি সাংস্কৃতিক ধারক হয়ে ওঠেন একটি জীবন্ত আর্কাইভ। একজন প্রবীণ মানুষ মারা গেলে হয়তো তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি গল্প; একটি পরিবার দেশত্যাগ করলে হারিয়ে যায় একটি সামাজিক স্মৃতি; আর একটি প্রজন্ম মাতৃভাষা ভুলে গেলে ভেঙে যায় একটি সভ্যতার ধারাবাহিকতা।
মধ্যনগরের বানাইদের প্রায় সবাই এখন ভূমিহীন। অথচ একসময় তাদের অনেকেরই জমিজমা ছিল। দেশত্যাগ, ভূমি হারানো এবং দখলদারত্বের নানা অভিযোগে সেই সম্পদ ক্রমে হাতছাড়া হয়েছে।
মোহনপুর গ্রামের গাঁওবুড়া বা বানাই সমাজের সমাজপতি লুদুর সিং বানাই এখন অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করেন। একই গ্রামের বৃদ্ধা কানন বালা বানাইয়ের অভিযোগ, প্রভাবশালীরা এক বিঘা জমি কিনে পরে ১০ বিঘার দলিল করে নিয়েছেন।
অভিযোগগুলোর প্রতিটি অবশ্যই আইনগত তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই যে বাস্তবতাটি স্পষ্ট—তা হলো, ভূমির ওপর নিরাপত্তা হারালে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক অস্তিত্বও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়। বানাইদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভূমি মানে বসতি, কৃষি, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চর্চা এবং নিজের ভূখণ্ডে থাকার অধিকার। তাই ভূমি হারানো মানে শুধু সম্পদ হারানো নয়; এটি জাতিসত্তার ভিত দুর্বল হয়ে যাওয়া।
দারিদ্র্যের কারণে বানাইদের মধ্যে শিক্ষার হারও অত্যন্ত কম। সরকারি চাকরিতে আছেন মাত্র দুজন—এমন তথ্যও উঠে এসেছে স্থানীয় পর্যবেক্ষণে। এত ক্ষুদ্র একটি জনগোষ্ঠীর জন্য এ সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় তাদের দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনারও একটি প্রতীক।
বানাইদের সবচেয়ে গভীর সংকট সম্ভবত তাদের ভাষা। লিখিত বর্ণমালা না থাকায় বানাই ভাষা এখনো মূলত পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে মুখে মুখে টিকে আছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ মাতৃভাষায় আর আগের মতো স্বচ্ছন্দ নয়। ফলে ভাষাটি ধীরে ধীরে জীবন্ত যোগাযোগের মাধ্যম থেকে স্মৃতির উপাদানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
একটি ভাষার শব্দভান্ডার কখনোই শুধু শব্দের সমষ্টি নয়। এর মধ্যে জমা থাকে একটি জনগোষ্ঠীর জীবনবোধ, প্রকৃতিকে দেখার নিজস্ব চোখ, সামাজিক সম্পর্ক, বিশ্বাস, রসবোধ, লোককথা, গান, কৃষিজ্ঞান এবং শত শত বছরের অভিজ্ঞতা। একটি ভাষা বিলুপ্ত হলে তাই শুধু কয়েক হাজার শব্দ হারায় না; হারিয়ে যায় একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক জগৎ।
বাংলাদেশে বানাই জনগোষ্ঠীর অন্যতম উচ্চশিক্ষিত প্রতিনিধি ও দীর্ঘদিনের পরিচিত বন্ধু রিপন বানাইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, বানাই ভাষায় একসময় অসংখ্য সাহিত্য, রূপকথা, ছড়া, কবিতা ও গান প্রচলিত ছিল। সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেসবের বড় অংশ হারিয়ে গেছে। তার এক ফুফু এখনো বানাই ভাষায় রচিত কিছু গল্প, ছড়া ও গান স্মরণে রেখেছেন। তিনি চলে গেলে সেই মৌখিক ঐতিহ্যের একটি অংশ হয়তো আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না।
বানাই ভাষার দৈনন্দিন সংখ্যাবাচক শব্দ—‘একং’, ‘বেকং’, ‘তুলসী’, ‘লেকং’-এর মতো শব্দগুলোও তাই নিছক সংখ্যা প্রকাশের উপায় নয়; এগুলো একটি জনগোষ্ঠীর ভাষাগত স্মৃতি ও সভ্যতার চিন্তার অংশ। যে ভাষা আজ শুধু ঘরের ভেতর টিকে আছে, সেটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্মের কাছে তা হয়তো শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন শব্দের তালিকা হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছে। অন্যদিকে সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি ও সম্প্রদায়’-এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আত্মপরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
পরিচয়ের প্রশ্নটি তাই নিছক শব্দের বিতর্ক নয়; এটি মর্যাদা, অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিক সম্পর্কের প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদের কাঠামো আরও স্পষ্ট ও অধিকারভিত্তিক করা প্রয়োজন—যাতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংস্কৃতি, মাতৃভাষা, ঐতিহ্য, ভূমি ও প্রথাগত সামাজিক অধিকারের সুরক্ষার বিষয়টি কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়। কারণ সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও অধিকার সুরক্ষার শক্ত ভিত্তি ছাড়া ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ অনেক সময় কাগজের প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি জরুরি—উন্নয়ন কার জন্য এবং কার অংশগ্রহণে?
পর্যটন, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের নানা পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ প্রায়ই যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। ফলে উন্নয়নের অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করে অন্যরা, আর যাদের ভূখণ্ডে উন্নয়নের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তারা কখনো কখনো আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
সমতলের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষায় তাই কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমতলের আদিবাসীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ও কার্যকর ভূমি কমিশন বা উপযুক্ত আইনগত কাঠামো গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
মধ্যনগরের সীমান্তবর্তী বানাইসহ সমতলের আদিবাসীদের ভূমি হারানো, দখল, জালিয়াতি বা বঞ্চনার অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্তের আওতায় এনে আইনানুগ প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ভূমির নিরাপত্তা ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
একইসঙ্গে প্রথাগত কৃষি, কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প এবং প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর ক্ষুদ্র অর্থনীতিকে রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনতে হবে। মাতৃভাষাভিত্তিক বা মাতৃভাষা-সহায়ক শিক্ষা, নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বানাইসহ প্রতিটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিল্প, সাহিত্য, লোকগান ও মৌখিক ঐতিহ্য জাতীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা করতে হবে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বঞ্চনা কাটিয়ে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ নীতিগত সহায়তা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি ন্যায়বিচারের দাবি।
হাওর ও পাহাড়ের সন্ধিস্থলে বানাইদের গল্প আসলে একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর গল্পের চেয়ে অনেক বড়। এটি ভূমি হারানোর গল্প, ভাষা হারানোর গল্প, স্মৃতি হারানোর গল্প—এবং একটি জাতিসত্তা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার গল্প।
কিন্তু এটি শুধু অতীতের বেদনা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা।
কোনো রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক ও গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে, যখন তার সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও নিজের ভাষা, ভূমি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের মধ্যে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার পায়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন উন্নয়নের মানচিত্রে মানুষ হারিয়ে যায় না; বরং তার পরিচয়, ইতিহাস ও অধিকার আরও সুরক্ষিত হয়।
মধ্যনগরের বানাইরা বাংলাদেশের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী নয়। তারা এই ভূখণ্ডের ইতিহাসের অংশ, এই দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ, এই সমাজেরই অংশ। তাদের ভাষা হারানো মানে বাংলাদেশের ভাষিক বৈচিত্র্যের একটি অধ্যায় হারানো। তাদের ভূমি হারানো মানে ইতিহাসের একটি ধারাবাহিকতা ছিন্ন হওয়া। আর তাদের জাতিসত্তা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মানে রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী চরিত্র থেকে একটি রং মুছে যাওয়া।
তাই এখন প্রশ্নটি আর বানাইরা টিকে থাকতে পারবে কি না—এটুকু নয়। প্রশ্নটি আরও কঠিন: রাষ্ট্র কি তাদের টিকে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রস্তুত?
আরও দেরি হলে হয়তো একদিন ইতিহাসের বইয়ে লেখা থাকবে—এ ভূখণ্ডে একসময় বানাই নামে একটি জাতিসত্তা বাস করত। তাদের ছিল নিজস্ব ভাষা, গান, গল্প, স্মৃতি ও সংস্কৃতি। কিন্তু তখন তাদের ভাষায় কথা বলার মতো মানুষ থাকবে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ইতিহাস লেখা নয়—ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা।
বানাই জনজাতিকে বিলুপ্তির তালিকায় যাওয়ার আগে রক্ষা করতে হবে। কারণ একটি জাতিসত্তাকে হারানো মানে শুধু কয়েকশ মানুষকে হারানো নয়; হারানো মানে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী আত্মার একটি অংশকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কেকে/এলএ