মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: চাঁদপুরে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫      বিএনপির পরিকল্পনা-কর্মসূচি সবসময়ই জনবান্ধব : প্রধানমন্ত্রী      প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী      হাসিনা ও হাদি হত্যাকারীদের ফেরাতে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের অনুরোধ      প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক      শহর-গ্রামে ডেঙ্গুর ভয়      চমক আসছে মন্ত্রিসভায়      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মাদকের মরণকামড়ে বিপন্ন তারুণ্য
আনিকা বিনতে আজিজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৯ এএম

একটি ভোরের দুটি খবর। রাজধানীর অভিজাত এলাকার সচ্ছল পরিবারের এক তরুণী মাদকের অতিরিক্ত ব্যবহারের পর হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেলেন। একই সময় ঢাকার একটি বস্তিতে মাদকের টাকা জোগাড় করতে এক কিশোর নিজের মায়ের ওপর হামলা চালিয়েছে। দুটি ঘটনা, দুটি ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা কিন্তু সংকট একটিই। শ্রেণি, অর্থ কিংবা সামাজিক অবস্থান-কোনোটিই যেন মাদকের ছোবল থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। 

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুম থেকে প্রান্তিক মানুষের জীর্ণ ঘর মাদকের বিষাক্ত থাবা পৌঁছে গেছে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে। প্রশ্ন তাই শুধু মাদক কতটা ছড়িয়েছে, তা নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন এক সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে নেশা মানুষের বিবেক, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে গ্রাস করবে? বাংলাদেশে মাদক এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক সমস্যা নয়। এটি একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং জাতীয় ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি। 

শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক। ফেনসিডিল, হেরোইন ও বিভিন্ন অবৈধ মাদকের পাশাপাশি ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’ এবং এলএসডির মতো সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে। সীমান্তপথে মাদকের প্রবেশের পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করেও মাদক কেনাবেচার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদনে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা লাখ লাখ বলে উঠে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। নারীদের মধ্যেও মাদক ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অর্থাৎ মাদক এখন আর শুধু ব্যক্তিগত নেশার বিষয় নয়; এটি একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা নষ্ট করার হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ প্রজন্ম। অথচ সেই তরুণদেরই একটি অংশ আজ মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। কৌতূহল, বন্ধু মহলের প্ররোচনা, পারিপার্শ্বিক চাপ কিংবা মানসিক অস্বস্তি থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষায় কেউ কেউ মাদকের দিকে পা বাড়ায়। শুরুটা অনেক সময় নিছক কৌতূহল কিংবা ‘একবার চেষ্টা’ হিসেবে হলেও পরবর্তী সময়ে তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। ধীরে ধীরে মাদক কেড়ে নেয় মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সৃজনশীলতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সক্ষমতা। ব্যাহত হয় পড়াশোনা ও কর্মজীবন, নষ্ট হয় সম্পর্ক, হারিয়ে যায় জীবনের লক্ষ্য।

যে তরুণদের হাত ধরে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি আসার কথা, তাদের একটি অংশ যদি নেশার কবলে পড়ে কর্মক্ষমতা হারায়, তবে এর ক্ষতি শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর অভিঘাত পড়ে পুরো রাষ্ট্রের ওপর। একটি প্রজন্মের মেধা ও কর্মশক্তির অপচয় কোনো দেশের জন্যই সামান্য ক্ষতি নয়।

মাদকের ক্ষতি ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে পরিবার ও সমাজকেও আক্রান্ত করে। পরিবারের একজন সদস্য মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে নষ্ট হতে থাকে পারস্পরিক আস্থা, স্বস্তি ও নিরাপত্তা। নেশার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ পরিবারের সম্পদ নষ্ট করে, কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সহিংসতা কিংবা অন্যান্য অপরাধের পেছনেও মাদকের ভূমিকা থাকতে পারে। পারিবারিক সহিংসতা ও নারীর ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রেও মাদক অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।

অন্যদিকে মাদক ও বেকারত্বের মধ্যেও রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক। মাদক একজন মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে তাকে বেকারত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে; আবার দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও কাউকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এভাবে তৈরি হয় একটি ভয়ংকর দুষ্টচক্র মাদক থেকে কর্মক্ষমতা হারানো, কর্মহীনতা থেকে হতাশা, আর হতাশা থেকে আরও গভীর মাদকনির্ভরতা। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা, পরিবার এবং অর্থনীতির ওপরও পড়ে। এ সংকট মোকাবিলায় শুধু বক্তৃতা, প্রচারাভিযান কিংবা খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ। মাদক চোরাচালানের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সীমান্ত নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে মাদকের প্রবেশপথ ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে। অভিযানের ক্ষেত্রে শুধু দৃশ্যমান খুচরা বিক্রেতাকে নয়, অর্থের উৎস, সরবরাহকারী চক্র এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও শনাক্ত করতে হবে।

তবে মাদকাসক্তিকে শুধু অপরাধের দৃষ্টিতে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। মাদকনির্ভর মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে। তাই তাদের মানবিক দৃষ্টিতে চিকিৎসা প্রয়োজনীয় ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে সরকারি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসেবা আরও বিস্তৃত করা জরুরি। চিকিৎসায় গোপনীয়তা, পেশাদারত্ব ও মানবিকতা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক লজ্জা ও অপমানের ভয়ে অনেক পরিবার চিকিৎসা নিতে দ্বিধা করে। এ মানসিকতা বদলাতে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

পুনর্বাসন শুধু মাদক ছাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। চিকিৎসার পর একজন মানুষ যেন পরিবার ও সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সেই সুযোগও তৈরি করতে হবে। প্রয়োজন হলে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক পুনঃএকীভূতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ একজন মানুষকে শুধু নেশা থেকে দূরে রাখা নয়, তাকে স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়াই পুনর্বাসনের প্রকৃত সাফল্য।

প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পরিবার। সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক গোপনীয়তা, অর্থের ব্যবহারে অস্বাভাবিকতা কিংবা সঙ্গ পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোকে অবহেলা করা যাবে না। তবে নজরদারির পাশাপাশি প্রয়োজন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও মানসিক সহায়তা। ভয় দেখিয়ে নয়, আস্থা তৈরি করেই তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে।  

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ লড়াইয়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। নিয়মিত মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। একইসঙ্গে তরুণদের সামনে সুস্থ বিকল্প তৈরি করতে হবে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগার, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ ও সৃজনশীল বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ শূন্যতা কখনো শূন্য থাকে না; সুস্থ বিকল্প না থাকলে সেই জায়গা দখল করতে পারে মাদক ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রবণতা। 

মাদকমুক্ত সমাজ গঠন কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সরকারের একার দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে সরবরাহ বন্ধে কঠোর হতে হবে, পরিবারকে হতে হবে সচেতন ও সহানুভূতিশীল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে প্রতিরোধমূলক ভূমিকা এবং সমাজকে মাদকনির্ভর মানুষকে ঘৃণা নয়, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। আজ যে তরুণটি মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, সে শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়; সে দেশের ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের সম্ভাবনা। 

তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু একটি অবৈধ পণ্য ঠেকানো নয় একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা। প্রশ্নটি তাই আমাদের সবার সামনে আমরা কি শুধু মাদকের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করব, নাকি এমন একটি সমাজও গড়ে তুলব, যেখানে একজন তরুণের সামনে নেশার চেয়ে জীবনের স্বপ্ন বড় হয়ে উঠবে? সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই। কারণ তারুণ্য হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রজন্ম নয়, হারিয়ে যায় একটি দেশের ভবিষ্যতের বড় একটি অংশ।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close