সিলেটের সবুজ পাহাড় আর টিলাগুলো এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শতাব্দী ধরে এই টিলাভূমি বৃষ্টির পানি ধরে রেখেছে, বন্যপ্রাণীর আবাস দিয়েছে, আর মাটির ক্ষয় ঠেকিয়ে রক্ষা করেছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য বদলে যাচ্ছে ভয়াবহভাবে।
জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের উৎলারপার ও শ্যামপুর এলাকায় প্রতি রাতে কাটা পড়ছে একের পর এক টিলা। রাতের অন্ধকারে যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখনই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে মাটিখেকো চক্রএই বৈপরীত্যই বলে দেয়, এই কর্মকাণ্ড কতটা পরিকল্পিত এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘটছে। প্রবাসী পরিবারের অসুস্থ বৃদ্ধ বাবাকে বাড়িতে একা রেখে দুই ভাই বিদেশে উপার্জনের আশায় গেছেন, আর সেই সুযোগে একটি চক্র জোরপূর্বক তাদের ভিটার দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের টিলা কেটে ফেলছে, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এটি সিলেটের কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পুরো সিলেটজুড়েই এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে।
৬০-৭০ ফুট উঁচু টিলা কেটে সমতল করে ফেলার এই প্রক্রিয়া একদিনে ঘটে না। প্রতিদিন শত শত ট্রাকে মাটি পাচার হয়ে যাচ্ছে আবাসন প্রকল্প ও নিচু জমি ভরাটের কাজে এটি সিলেট বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংগঠিত ও লাভজনক অর্থনৈতিক কাঠামো, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে পরিবহন, ক্রেতা, আর নিশ্চিতভাবেই স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অংশের নীরব সমঝোতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বহুবার, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযান চালানো হলেও ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া যায়নি যা প্রশ্ন তোলে অভিযানের সময় ও পদ্ধতি নিয়ে। যে চক্র নিয়মিত ভোররাতে সক্রিয় থাকে, দিনের বেলা পরিচালিত অভিযানে তাদের ধরা না পড়াটা অস্বাভাবিক নয়; বরং এটি ইঙ্গিত দেয়, অভিযানের সময়সূচি হয়তো আগেভাগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ। বিভাগীয় কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে অথচ বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, শুধু কাগুজে অভিযোগের অপেক্ষায় বসে থাকা একটি দায়িত্বশীল সংস্থার কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ প্রতিটি সংস্থাই যখন একে অপরের দিকে দায় ঠেলে নীরব থাকে, তখন সেই শূন্যতার সুযোগ নেয় মাটিখেকো চক্র।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদেরও প্রশাসন-সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাতের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই বাস্তবতা শুধু জৈন্তাপুরের নয় সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায়, এমনকি সারা দেশেই পাহাড় ও টিলা কাটার ক্ষেত্রে অনুরূপ প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছাপ স্পষ্ট। ফলে এই সংকট নিরসনে কিছু কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। রাত্রিকালীন টহল ও আকস্মিক অভিযান নিশ্চিত করতে হবে, যেহেতু টিলা কাটার মূল কার্যক্রম ভোররাতে সংঘটিত হয়। দিনের আনুষ্ঠানিক অভিযানের বদলে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর গোপন অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, এবং তদন্ত প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে—কেবল চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে।
মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক ও যন্ত্রপাতি জব্দ করে সরবরাহ চক্র ভেঙে দিতে হবে, কারণ ক্রেতা ও পরিবহনকারীদের জবাবদিহিতা ছাড়া শুধু কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ তদন্ত করতে একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করা প্রয়োজন, যাতে অভিযানের তথ্য কীভাবে আগেভাগে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, তা উদ্ঘাটিত হয়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা নির্ভয়ে এসব অনিয়ম উন্মোচন করতে পারেন। এখনই যদি কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে সিলেটের সবুজ পাহাড়গুলো একদিন কেবল স্মৃতি হয়ে থাকবে আর তার দায় এড়াতে পারবে না কেউই।
কেকে/ এমএস