শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমানের চিঠি      হামে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৮৩৩      জুলাই চেতনা নিয়ে ব্যবসা না করার আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      খাদ্য অধিদপ্তরে এখনো ফ্যাসিস্টের ‘সেই’ ভূত      ধুঁকছে কমিউনিটি ক্লিনিক      বাংলাদেশ-চীন করিডোর প্রস্তাবের দিকে নজর রাখছে ভারত      জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের স্মরণসভা আজ      
বিনোদন
থিয়েটার স্লোগানের ‘জলপুত্র’ : জলজীবনের হৃদয়স্পর্শী মহাকাব্য
পায়েল বিশ্বাস
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৪:২৫ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের (টিআইসি) মূল মঞ্চে ​শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যায় দর্শকাসনে বসে যখন থিয়েটার স্লোগানের ২৮তম প্রযোজনা ‘জলপুত্র’ দেখছিলাম, তখন আক্ষরিক অর্থেই আড়াই ঘণ্টার জন্য নাগরিক কোলাহল ভুলে হারিয়ে গিয়েছিলাম কোনো এক অবাধ্য নদীর মোহনায়। মিলনায়তনের চার দেয়াল যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জেগে উঠেছিল নোনা জলেরগন্ধ, ঢেউয়ের গর্জন আর একদল প্রান্তিক মানুষের বুকফাটা হাহাকার।

​নাট্যকার ও নির্দেশক লালন দাশ তার সমস্ত মেধা ও শ্রম ঢেলে দিয়ে জলপুত্রের যে জীবনচিত্র মঞ্চে এঁকেছেন, তা কেবল জেলে জীবনের গল্প নয়; বরং তা মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক আদিম ও চিরন্তন লড়াইয়ের দলিল।

​নাটকের শুরুটা বেশ নান্দনিক। নদীর ছলছল শব্দে জলপুত্রদের ঘুম ভাঙা, জীবিকার তাগিদে উত্তাল স্রোতে স্বপ্নের নাও ভাসানো আর মাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক সরল জীবনকথন দিয়ে কাহিনীর সূত্রপাত। কিন্তু এই সরলতা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। নাটকের মূল দ্বন্দ্বটা তৈরি হয় তখনই, যখন এই শান্ত জলে থাবা বসায় সমাজের উচ্চবর্গের আধিপত্য। মহাজনের দাদন, চড়া সুদের নির্মম হিসাব আর ক্ষমতার লোভ কীভাবে জেলেদের এতটুকু সুখকেও বিশাদের অন্ধকারে সমাহিত করে, তা সংলাপে ও দৃশ্যায়নে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। শোষক আর শোষিতের এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক লড়াই দর্শককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থিয়েটারের সিটে ধরে রাখতে বাধ্য করে।

​এই নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর অভিনয়শিল্পীদের মেলবন্ধন। মঞ্চে প্রতিটি চরিত্রের অবস্থান, মুভমেন্ট ও তাদের মধ্যকার রসায়ন ছিল নিখুঁত। টুটুল গাঙ্গুলী, সুধাম দাশ, বিপ্লব দে ও রাজীব চৌধুরী তাদের শক্তিশালী অভিনয়ে শোষিত ও শোষকের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বটিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বীণা দাশগুপ্তা, নূর স্বপ্ন, ডেইজী বড়ুয়া ও পপি দাশের সাবলীল ও আবেগঘন প্রক্ষেপণ দর্শকদের চোখে জল এনে দিয়েছে।

​পাশাপাশি সুনপ বড়ুয়া, সজীব বাঙালী, সম্প্রীতি বড়ুয়া, নির্বানা বড়ুয়া, সত্যজিৎ দাশ, রতন সরকার, অভিষেক চক্রবর্তী ও দীলিপ দাশের চমৎকার টিম-ওয়ার্ক পুরো নাটকের গতিকে এক মুহূর্তের জন্যও ঝিমিয়ে পড়তে দেয়নি। কোনো রকম অতিনাটকীয়তা ছাড়াই প্রান্তিক মানুষের ভেতরের আগুনকে কীভাবে মঞ্চে মূর্ত করে তোলা যায়, ‘জলপুত্র’ তার এক অনন্য উদাহরণ।

​নির্দেশনার পাশাপাশি লালন দাশের করা মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা ছিল এককথায় অনবদ্য। প্রতীকী নৌকার ব্যবহার এবং আলোর প্রক্ষেপণে ভোরের আলো থেকে শুরু করে মাঝনদীর রূপালী জোছনা কিংবা মহাজনের গদিতে শোষণের সেই থমথমে অন্ধকার— প্রতিটি আবহকে আলো দিয়ে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

​নাটকের অন্যতম সেরা অংশ ছিল এর সঙ্গীত ও কোরিওগ্রাফি। প্রীতি কণা দাশের চমৎকার গান সিলেকশান ও আবহ মিউজিক প্রতিটি দৃশ্যের আবেগকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে, লালন দাশের নিজস্ব কথা ও সুরে ‘নৌকা ভাসানের গান’ সরাসরি দর্শকের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। লালন দাশের কোরিওগ্রাফি পরিকল্পনায় নূর স্বপ্নের পরিচালনায় কোরিওগ্রাফিগুলো মঞ্চে এক অদ্ভুত নান্দনিকতার সৃষ্টি করেছিল। রাজু কান্তি দাশের নিখুঁত শব্দ সংযোজন এবং বীণা দাশ গুপ্তার বাস্তবসম্মত মেকাপ ও কস্টিউমস ডিজাইন চরিত্রগুলোকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

​একটি সফল নাটকের পেছনে থাকে অন্তরালের মানুষদের অক্লান্ত পরিশ্রম। প্রযোজনা অধিকর্তা অভিজিৎ তালুকদার ও রুবেল দাশের দূরদর্শী ব্যবস্থাপনায় পুরো আয়োজনটি ছিল সুশৃঙ্খল। পর্দার আড়ালে থেকে মো. আলীফ, লাবলী আক্তার, মোশাররফ ভূঁইয়া পলাশ, শম্পা দাশ, নূর আফরীণ, লিজা দাশ ও সোহেল তানবীরা যেভাবে পুরো টিমকে সাপোর্ট দিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

​সেই সাথে দীপক চৌধুরী, শেখ শওকত ইকবাল চৌধুরী, মোশাররফ দোভাষ, সুচরিত চৌধুরী টিংকু ও পার্থ প্রতীম নাহা রণির সার্বিক সহযোগিতা এই প্রযোজনাকে আরও বেগবান করেছে।

​নাটকের প্রথমার্ধে জেলেদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক আবহ তৈরি করতে গিয়ে কাহিনীর গতি কিছুটা ধীর ছিল। দৃশ্যপট ও পরিবেশ তৈরিতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় নেওয়ায় মূল দ্বন্দ্ব (মহাজনের শোষণ ও আধিপত্য) শুরু হতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। নাটকের শুরুর দিকের কিছু দৃশ্য এবং সংলাপ কিছুটা ছেঁটে ফেললে কাহিনীর গতিশীলতা আরও বাড়ত এবং দর্শক শুরুতেই আরও বেশি আচ্ছন্ন হতে পারত।

​সমাজের উচ্চবর্গ বা মহাজন চরিত্রগুলোর রূপায়ণ কিছুটা চেনা ছকে বা একমাত্রিক মনে হয়েছে। বাংলা নাটকে বা সিনেমায় শোষক বলতে আমরা ঢালাওভাবে যে নিষ্ঠুর অঙ্গভঙ্গি বা অট্টহাসি দেখতে অভ্যস্ত, এখানেও খলচরিত্রগুলোর আচরণ কিছুটা তেমনই ছিল। শোষণের এই জায়গাটিতে যদি আরেকটু মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বা সূক্ষ্মতা রাখা যেত, তবে খলচরিত্রগুলো কেবল ‘খল’ না হয়ে সমাজের এক গভীর ও বাস্তব রূপ হয়ে উঠত।

​নৌকা ভাসানের গান এবং কোরিওগ্রাফিগুলো আলাদাভাবে অত্যন্ত চমৎকার ও নান্দনিক ছিল। তবে কিছু কিছু দৃশ্যে সংলাপের চেয়ে কোরিওগ্রাফি এবং আবহ সঙ্গীতের আধিপত্য বেশি ছিল, যা মূল কাহিনীর গতিকে সাময়িকভাবে মন্থর করে দিয়েছে। বিশেষ করে আবেগঘন বা গম্ভীর সংলাপে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ভলিউম সামান্য বেশি থাকায় পেছনের সারির দর্শকদের জন্য সংলাপের কিছু অংশ পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়া কঠিন ছিল। সাউন্ড ডিজাইনে লাইভ ও ট্র্যাক মিউজিকের ভারসাম্য আরেকটু নিখুঁত করা প্রয়োজন।

​যেহেতু এটি নদী ও জেলেদের জীবনের গল্প, তাই সংলাপে আঞ্চলিক বা উপভাষার ব্যবহার ছিল অবধারিত। অভিনেতারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন, তবে পুরো নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব চরিত্রের মুখে এই ভাষার টান বা শুদ্ধতা সমানভাবে বজায় থাকেনি। কিছু কিছু জায়গায় অভিনেতাদের অজান্তেই শহুরে বা প্রমিত উচ্চারণের মিশ্রণ ঘটে গেছে, যা চরিত্রের বাস্তবতাকে সাময়িকভাবে বিঘ্নিত করে।

​নাটকের শেষাংশে যখন জলপুত্রদের ভেতরের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে, সেই ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যটি দর্শককে নাড়া দিলেও তা কিছুটা দ্রুত শেষ হয়ে গেছে বলে মনে হয়। যে দ্বন্দ্বটি পুরো নাটকে ধীরে ধীরে দানা বেঁধেছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি বা সমাধানের দৃশ্যটি আরেকটু সময় নিয়ে, আরও জোরালো এবং বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা যেত।

​এই ছোটখাটো ত্রুটিগুলো বাদ দিলে, একটি নতুন প্রযোজনা হিসেবে ‘জলপুত্র’-এর গুণগত মান কিন্তু বেশ ওপরে। বিশেষ করে সীমিত সাধ্যের মধ্যে লালন দাশের মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা এবং বিশাল কাস্টিং নিয়ে থিয়েটার স্লোগানের টিম-ওয়ার্ক সত্যিই প্রশংসনীয়। পরবর্তী প্রদর্শনীগুলোতে এই কারিগরি ও সংলাগত সূক্ষ্ম জায়গাগুলো একটু ঘষেমেজে নিলে ‘জলপুত্র’ চট্টগ্রামের মঞ্চে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে টিকে থাকবে।

​থিয়েটার স্লোগানের সকল কলাকুশলীর অদম্য প্রচেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রমের ফসল এই ‘জলপুত্র’। এটি কেবল বিনোদনের জন্য মঞ্চস্থ কোনো নাটক নয়, এটি সমাজের শোষিত শ্রেণির অধিকার আদায়ের এক জোরালো স্লোগান।

​প্রদর্শনী শেষ হয়ে যাওয়ার পর হলের আলো যখন জ্বলে উঠল, তখনও দর্শকদের করতালির শব্দে মুখরিত ছিল চারপাশ। যারা এই প্রদর্শনীটি দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই আমার মতো এক বুক ভালো লাগা আর মাথার ভেতর একরাশ সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  থিয়েটার স্লোগান   নাটক জলপুত্র   জলজীবনের মহাকাব্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close