সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
শিরোনাম: রক্ষা পেলেন না বেনজীর      পার্থকে সভাপতি করে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন      ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব নিয়োগ বাতিল      হামের উপসর্গে আরও চার প্রাণহানি, মোট মৃত্যু সাড়ে ৬০০ ছাড়াল      জয় দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু বাংলাদেশের      ভেস্তে গেল অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করার স্বপ্ন      বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারে আগ্রহী ফ্রান্স      
খোলাকাগজ স্পেশাল
রক্ষা পেলেন না বেনজীর
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ৯:০৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলার প্রেক্ষাপটে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসেন গতকাল রোববার গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, দুদকের মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১২ জুন একটি চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষ।

তবে বেনজীর আহমেদকে কোন মামলার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে কিংবা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

দুবাইয়ে যেভাবে গ্রেপ্তার হন:

বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল সাবেক পুলিশ প্রধানের। সে অনুযায়ী, নির্ধারিত ফ্লাইটে অন্যদের সঙ্গে তিনিও দুবাই বিমানবন্দরে নামেন। এ সময় বিমানবন্দরের এআই ক্যামেরা তার চেহারা স্ক্যান করে দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল শাখায় নোটিস করে। পরে তারা এসে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক মামলা করে দুদক। এসব অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবেই তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।

বেনজীর গ্রেপ্তার পুলিশের ঐতিহাসিক সাফল্য : সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দুর্নীতির মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটিকে পুলিশের ঐতিহাসিক সাফল্য বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।’

বেনজীর আহমেদকে ১২ জুন গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শিগগির তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানান তিনি। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই রেড নোটিসের মাধ্যমে ইন্টারপোল সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানায়। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হয় বলেও মন্ত্রী জানান।

পাঠাতে হবে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ:

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে। এনসিবি (পুলিশ সদর দপ্তরের একটি শাখা, যারা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে) আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে। অতি দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‌্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তখনই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। তার বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।

সাবেক এক আইজিপির আমলনামা :

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, প্রবল প্রতাপ নিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের বেনজীর আহমেদ। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের পর র‌্যাবের মহাপরিচালক হয়েছিলেন, পুলিশের শীর্ষ পদেও বসানো হয়েছিল তাকে। অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ গড়ার খবর তখনই উঠেছিল। একপর্যায়ে যখন তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই দেশ ছাড়েন তিনি সপরিবারে। তার কয়েক মাসের মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে গতি পায়। তার আরও দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসে। বেশ কয়েকটি মামলার পর আদালত থেকে আসে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তাকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি হয়।

১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র‌্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জমি দখল, অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়া বেনজীরের কীর্তিকলাপের মধ্যে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ :

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। এই ঘটনার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি।

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে র‌্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। এসব মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার তথ্য অনুসারে, বেনজীর ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রী জীশান মীর্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। তাদের বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে ঢাকার গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ৩টি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসা করার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের সন্ধান পায় দুদক। দুদকের আবেদনে এসব সম্পদ জব্দ করার আদেশ দেন আদালত। দুদকের মামলায়ই গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন ঢাকার আদালত।

অর্থ পাচারের অভিযোগ :

বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। দুদক ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুদকের কর্মকর্তারা বলেন, ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণের পর কোথাও বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া যায়নি। এ টাকা তুলে নেওয়ার পরপরই তিনি বিদেশ চলে যান। দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর দুদকের অনুসন্ধান শুরু হলে ২০২৪ সালের ৪ মে দেশ ছেড়েছিলেন বেনজীর।

ভয় দেখিয়ে সংখ্যালঘুদের জমি কিনে নেওয়া :

নিজের এলাকা গোপালগঞ্জের বিশাল এলাকাজুড়ে রিসোর্ট গড়ে তুলেছিলেন বেনজীর। নিজের ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে কয়েক শ বিঘা জমি কেনেন তিনি। এসব জমির প্রায় সবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। তারা বলছেন, জমি বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। ভয় দেখিয়ে, জোর করে এবং নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমিগুলো কেনা হয়। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল গ্রামে ৬০০ বিঘার বেশি জমির ওপর তিনি গড়ে তোলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। পরে আদালত পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা জব্দের নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের জুনেই সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডেমরা-ইছাপুরা সড়কের পাশে ২৪ কাঠা জায়গাজুড়ে একটি বাড়ি করেন বেনজীর আহমেদ। নিজের মেয়ের মালিকানাধীন বাড়িটির নাম দেওয়া হয় সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড। এর আগে আনন্দ হাউজিং সোসাইটির নামে স্থানীয় প্রেমানন্দ সরকারের মালিকানাধীন একটি ৫৫ শতাংশের জলাশয় জোর করে ভরাট করা হয়। পরে ভরাট করা ওই জমি ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কিনে নেন বেনজীর আহমেদ।

ভুয়া পিএইচডি অর্জন :

আইজিপি হয়ে বেনজীর আহমেদ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। এর পর থেকে তিনি নামের আগে ‘ডক্টর’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন। তবে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাই তার ছিল না। শর্ত শিথিল করে তাকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বেনজীর আহমেদ ডক্টরেট ডিগ্রি নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) প্রোগ্রাম থেকে। সেখানে ভর্তির জন্য স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হয়। শিক্ষাজীবনের সব পাবলিক পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হয়। বেনজীরের তা ছিল না। পরে বেনজীর আহমেদের ডক্টরেট ডিগ্রি স্থগিত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

পাসপোর্ট কেলেঙ্কারি :

সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় সেই তথ্য গোপন করে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পাসপোর্ট নিয়েছিলেন বেনজীর আহমেদ। এই কাজটি তিনি করেছিলেন ২০১৬ সালে, তখন তিনি র‌্যাবের মহাপরিচালক। বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন তিনি করলে তখন আপত্তি জানিয়েছিল পাসপোর্ট অধিদপ্তর। র‌্যাব সদর দপ্তরে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। জবাবে র‌্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল জলিল মণ্ডল অবিলম্বে বেনজীরের পাসপোর্ট প্রতিস্থাপনের অনুরোধ করে চিঠি দেন। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেনজীরকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ নেওয়া হয় তার বাসায় গিয়ে। এটি সরকারি চাকরিবিধি ও পাসপোর্ট আইনে অপরাধ হলেও বেনজীরের কিছুই হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা :

২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন, যদিও তখন র‌্যাবে দায়িত্ব পালন শেষে আইজিপি পদে ছিলেন তিনি। তিনি র‌্যাবের প্রধান ছিলেন ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ২০২২ সালের আগস্টে বেনজীর আহমেদ জাতিসংঘের পুলিশপ্রধান সম্মেলনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান। তবে সম্মেলনের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার বাইরে ওই সফরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোথাও তিনি যেতে পারেননি।

দুবাই থেকে বেনজীরকে কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে :

বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বিদেশে পলাতক প্রভাবশালী আসামিদের ফেরানোর প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিসের ভিত্তিতে বেনজীর আহমেদকে ১২ জুন গ্রেপ্তার করে দুবাইয়ের পুলিশ। এ কথা সরকার জানিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, তাকে কত দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যাবে?

ইন্টারপোলের সঙ্গে প্রতিটি সদস্যদেশের কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও সমন্বয়কারী সংস্থা হলো ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। বাংলাদেশে এটি পুলিশ সদর দপ্তরে অবস্থিত এবং তা আন্তর্জাতিক অপরাধী ও পলাতক ব্যক্তিদের তথ্য আদান-প্রদান ও গ্রেপ্তারে কাজ করে। বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে অতীতে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে কাজ করছেন—এমন পাঁচ কর্মকর্তা পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজীরের গ্রেপ্তার অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বড় অগ্রগতি। তবে এটি শেষ ধাপ নয়। পুলিশের রেড নোটিসে কোনো ব্যক্তি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হতে পারেন; কিন্তু তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো নির্ভর করে যে দেশে তিনি আটক হয়েছেন, সেই দেশের আইন, আদালত, প্রত্যর্পণসংক্রান্ত চুক্তি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং মামলার নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে। এনসিবি আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আশাবাদী, অতি দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যাবে।

রেড নোটিশ থাকলে কী হয়

অনেকের মধ্যে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নিয়ে সাধারণভাবে একটি ভুল ধারণা আছে—এটি যেন আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। বাস্তবে তা নয়। রেড নোটিস হলো ইন্টারপোলের সদস্যদেশগুলোর কাছে একটি অনুরোধ, যাতে কোনো পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত, অবস্থান নির্ধারণ এবং প্রয়োজনে সাময়িকভাবে আটক করা যায়। এর ভিত্তি হতে হয় সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা বিচারিক আদেশ।

অর্থাৎ, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি হওয়া এবং দুবাইয়ে তার গ্রেপ্তার—দুটি বড় ধাপ পার হয়েছে; কিন্তু তাকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেবে আমিরাতের আদালত। বাংলাদেশকে এখন প্রমাণ করতে হবে, বেনজীরের বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নয়; এটি দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, জালিয়াতি, মানিলন্ডারিং বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে দেখাতে হবে, বাংলাদেশে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।

কোন প্রক্রিয়ায় ফেরানো হতে পারে :

পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেনজীরকে ফেরাতে বাংলাদেশকে সাধারণত কয়েক ধরনের নথি পাঠাতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র বা তদন্তসংক্রান্ত সারসংক্ষেপ, তার পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, অপরাধের বিবরণ, সংশ্লিষ্ট আইন ও শাস্তির বিধান, আদালতের আদেশ এবং প্রত্যর্পণের আইনি ভিত্তি। এসব নথি আমিরাত কর্তৃপক্ষের গ্রহণযোগ্য ভাষায় অনুবাদ ও প্রত্যয়ন করতে হতে পারে।

প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাওয়ার পর আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে নথিপত্র যাচাই করবে। এরপর বিষয়টি আদালতের সামনে যেতে পারে। সে দেশের আদালত দেখবে, যে অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশ বেনজীর আহমেদকে ফেরত চাইছে, সেই ধরনের অপরাধ আমিরাতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না।

তবে আদালত আরও কিছু বিষয় বিবেচনা করতে পারে। যেমন, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, একই ঘটনায় আগে কোথাও বিচার হয়েছে কি না, মামলা বা দণ্ড সময়সীমার কারণে অকার্যকর হয়েছে কি না, আসামির মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না, অথবা তাকে ফেরত পাঠালে অমানবিক আচরণ বা অন্য কোনো আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কি না।

বেনজীরের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা কতটা :

আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, বেনজীরকে ফেরানোর সম্ভাবনা আগের অনেক রেড নোটিশভুক্ত পলাতক আসামির তুলনায় বেশি। এর কয়েকটি কারণ আছে।

প্রথমত, বেনজীর আহমেদ এখন আমিরাত কর্তৃপক্ষের হেফাজতে আছেন। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেড নোটিস জারি করাতে পারলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি, অথবা সংশ্লিষ্ট দেশ তাকে গ্রেপ্তার করেনি। অনেকের পরিচয়ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। বেনজীরের ক্ষেত্রে অন্তত সেই বাধা আপাতত নেই।

দ্বিতীয়ত, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আর্থিক অপরাধ ও দুর্নীতিকেন্দ্রিক। শেখ হাসিনাসহ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস চাওয়ার ক্ষেত্রে ইন্টারপোল এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের প্রশ্নে বেশি সতর্ক থাকে। বেনজীরের ক্ষেত্রে অভিযোগের চরিত্র তুলনামূলকভাবে ‘অর্ডিনারি ক্রিমিনাল অফেন্স’ বা সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে দেখানোর সুযোগ বেশি।

তৃতীয়ত, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। বেনজীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ছয়টি মামলার মধ্যে একটি অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। আদালতের আদেশ, অভিযোগপত্র ও অবৈধ সম্পদ-সংক্রান্ত নথি প্রত্যর্পণ অনুরোধকে শক্তিশালী করতে পারে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পলাতক দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও রেড নোটিশ দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ফল দেয়নি। তাঁদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকলেও ফেরানো যায়নি। কারণ হিসেবে কূটনৈতিক জটিলতা, আশ্রয় বা অবস্থান-সংক্রান্ত আইনি সুরক্ষা, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব মানবাধিকার-সংক্রান্ত অবস্থানকে বড় বাধা হিসেবে দেখা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে বাংলাদেশ অন্তত ২৫ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ চেয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্য, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিরা।

এখন বাংলাদেশের করণীয় :

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেনজীর আহমেদ শুধু একজন পলাতক আসামি নন; তিনি একসময় বাংলাদেশের পুলিশপ্রধান ছিলেন, তার আগে র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর তিনি দেশ ছাড়েন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে ফেরানো গেলে এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও সরকারের জন্য বড় প্রতীকী সাফল্য হবে।

তবে বেনজীরকে ফেরানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে এখন সময়সীমা স্পষ্ট। গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে। এই সময়ের মধ্যে নথিপত্রে কোনো ঘাটতি থাকলে তা আমিরাতের আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু রেড নোটিস ও গ্রেপ্তারের খবর দিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। প্রত্যর্পণ অনুরোধে মামলার শক্ত ভিত্তি দেখাতে হবে। কোন অপরাধে তাকে চাওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশের কোন আইনে অভিযোগ, আমিরাতের আইনে তার সমতুল্য অপরাধ কী, বিচারপ্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা কী, তার বিরুদ্ধে আদালতের কী আদেশ আছে—সবকিছু নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বেনজীর   স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close