চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনীতি থেকে ছিটকে গেছে আওয়ামী লীগ। বেশির ভাগ সিনিয়র নেতাকর্মী আত্মগোপনে। অনেকে কারাগারে। অনেকে বিদেশে পালিয়েছেন। এখন দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করছেন তারা। এজন্য প্রতিনিয়ত সামাজিকমাধ্যমে গুজব, প্রোপাগান্ডা ছড়ানোসহ নানা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে দলটি। নেতাকর্মীরা রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় মিছিল-মিটিং করছেন। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে তারা এসব করে যাচ্ছেন। প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এসব কার্যক্রমের সুযোগ করে দিচ্ছেন। অনেক জায়গায় টাকা-পয়সা দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সুবিধাবাদী নেতাকর্মীদেরও তারা হাত করছেন।
আবার বিভিন্ন জেলায় বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলাও করছেন। বিদেশে বসে পলাতক নেতারা কলকাঠি নাড়ছেন। কোথায়, কখন মিছিল করতে হবে, কোথায় হামলা করতে হবে, কোন কোন বিষয় নিয়ে গুজব ছড়াতে হবে, কারা শেল্টার দেবে—এসব নিয়ন্ত্রণ করছেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সম্মুখসারির বিভিন্ন নেতাকর্মীর ওপরও দেশে-বিদেশে তারা আক্রোশ প্রকাশ করছেন। যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বাংলাদেশবিষয়ক একটি আলোচনা সভায় অংশ নিতে যাওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রতিহত ও হেনস্তার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
গতকাল রোববার অনুষ্ঠানে হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। এই সফর প্রতিহত করতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘৭১-এর পক্ষশক্তি, যুক্তরাজ্য’ ব্যানারে প্রতিরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও আওয়ামী লীগ নেতা সুশান্ত দাশগুপ্ত এই কর্মসূচিকে ‘মিশন বাদাম’ হিসেবে উল্লেখ করে হাসনাতদের যে কোনো মূল্যে প্রতিহতের ঘোষণা দেন।
এদিকে, দেশে রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কৌশলে পুনরায় রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এজন্য তারা ভয়ঙ্কর সব ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তারা দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টাও করছেন। বিশেষ করে গোপন পরিকল্পনার মাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়কে কাজে লাগিয়ে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র বলছে, অশুভ উদ্দেশ্যে দেশের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী হামলার নাটক মঞ্চস্থ করতে ছক আঁকছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও তাদের সহায়ক শক্তি। বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের প্রাক্কালে তারা এমন একটি পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাতে চাইছে, যেন দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীদের প্রচেষ্টাসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মিতব্য রামচন্দ্র মূর্তিকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত এবং মুসলিম কর্তৃক হিন্দুদের ওপর আক্রমণের জন্য উসকানি প্রদান। সাম্প্রতিক সময়ে তারা এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উদ্দেশ্যমূলক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, যেসব ব্যক্তি এই সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মূল ভূমিকা রাখছেন, তাদের কয়েকজনের নামও এরই মধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—দেশের বাইরে অবস্থান করা (সম্ভাব্য কলকাতা) যুবলীগ নেতা সুভাষ, এরাম, পিকক, ড্রাগন বারের মালিক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম উদ্যোক্তা ও পরিচালক ফিরোজুর রহমান অলিউ ও তার মেজ ছেলে হিরা প্রমুখ। এছাড়া আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি বৃহৎ অংশও পূর্ণমাত্রায় সরব রয়েছেন। তারা প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ফেরাতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র আরও বলছে, নির্দিষ্ট ওই গোষ্ঠীটি রংপুরের রামকৃষ্ণ আশ্রম ও রামকৃষ্ণ মিশন, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে নির্মিতব্য রামচন্দ্র মূর্তি, বগুড়া জেলার অন্তর্গত বিভিন্ন হিন্দুপাড়া, ভবানীপুরসহ (শেরপুর) ঢাকা এবং চট্টগ্রামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান লক্ষ্য করে চোরাগোপ্তা হামলার পরিকল্পনাও করছে। নিষিদ্ধ গোষ্ঠী ও তাদের সহায়ক শক্তি এসব হামলার ঘটনা বাস্তবায়নে সফল হলে বাংলাদেশে তাদের পুনর্বাসন সহজতর, নির্বাচিত সরকারকে বহির্বিশ্বে অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করার পাশাপাশি বাংলাদেশে আবার ‘জঙ্গি তৎপরতা’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে—এ ধরনের কাহিনি তৈরি ও প্রচার করছে।
এছাড়াও বিশেষ একটি রাষ্ট্রের (রাজনৈতিক ও তথ্য) কূটনীতিবিদ, (কনস্যুলার এবং শিক্ষা) কূটনীতিবিদ এবং ডেপুটি হাইকমিশনারের সঙ্গে একটি ধর্মীয় সংগঠনের কমিটির সভাপতির একাধিকবার বৈঠক, পরিচয় গোপন করে স্পর্শকাতর স্থাপনা এলাকায় বিদেশি কূটনীতিবিদের বিচরণের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। এসবের সঙ্গে উল্লিখিত চলমান চক্রান্তের সম্পর্কও রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানী ইউনিটে কাজ করা বাংলাদেশি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান ওরফে সামি সম্প্রতি তার ফেসবুক পোস্টে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছেন।
এদিকে, দেশের বিভিন্ন জেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ও তাদের সহযোগীদের বিক্ষিপ্ত মিছিল ঘিরে চিহ্নিত কিছু গণমাধ্যম তাদের কার্যক্রমের প্রতি নানাভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতা ও নির্লিপ্ততা বর্তমানে চিন্তা বাড়াচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন স্তরে থাকা নিষিদ্ধ সংগঠন-সমর্থক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন এ ধরনের শঙ্কা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারকে এখনই এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। সরকারের যথাযথ মহল নিরাপত্তা সংস্থাসমূহের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলা দমন-পীড়ন, বিতর্কিত নির্বাচন এবং অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির ফলেই তাদের (আওয়ামী লীগ) এই পতন ঘটেছে। এটি ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান। জাতিসংঘের হিসেবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের হাতে কমপক্ষে ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তারপরও তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। তারা প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। একটা বড় রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে এমনটা কোনোভাবেই আশা করা যায় না।
যদিও সরকার ও পুলিশ প্রশাসন কার্যক্রমে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়া ঝটিকা মিছিল, নাশকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেকে/এলএ