কথিত বাংলাদেশি বলে নাগরিকদের পুশইনের জন্য একের পর এক অপচেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী (বিএসএফ)। গতকাল রোববারও চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত দিয়ে ১১ নারী-পুরুষকে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে। একই সীমান্ত এলাকায় দুপুরে আরও ১২৫ জনকে জড়ো করে বিএসএফ। যদিও সীমান্তে কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন বিজিবির সদস্যরা। ঈদুল আজহার ছুটির পর থেকেই পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ। সীমান্তে প্রতিনিয়ত তারা উত্তেজনা তৈরি করছে। গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। অনৈতিকভাবে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্যও তারা মরিয়া হয়ে আছে। কলকাতায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
চুয়াডাঙ্গায় ১২৫ জনকে জড়ো করেছে বিএসএফ
বিএসএফ চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত দিয়ে ১১ নারী-পুরুষকে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে। গতকাল রোববার ভোর ৪টার দিকে সীমান্তের ৭৭ এস-২ পিলারের পাশ দিয়ে এ চেষ্টা চালানো হয়। তবে বিজিবির প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়। এদিকে দুপুরে আরও ১২৫ জনকে সীমান্ত এলাকায় জড়ো করা হয়েছে বলে তথ্য পায় বিজিবি। যদিও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিএসএফ তাদের পুশইন করতে পারেনি।
চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) পরিচালক ও অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, বিএসএফ ১১ জন বাংলাভাষী নারী-পুরুষকে পুশইনের চেষ্টা চালায়। বিজিবি সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে তারা ব্যর্থ হয় এবং ওই ব্যক্তিদের সরিয়ে নেয়। বিজিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএসএফ ওই ১১ জনকে দর্শনা-জয়নগর সীমান্ত থেকে বারাদী-সুলতানপুরের বিপরীতে নিয়ে গেছে। নিজস্ব সূত্রে জানতে পেরেছি, দুপুরে আরও ১২৫ জনকে পুশইনের জন্য সীমান্তের বিপরীতে জড়ো করে রাখা হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিজিবি কঠোর অবস্থানে আছে।’ সাম্প্রতিক সময়ে এই সীমান্তে বিএসএফের এটিই প্রথম পুশইনের চেষ্টা। বিভিন্ন সীমান্তে পুশইনের চেষ্টার ঘটনার পর ৬ বিজিবি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
কুড়িগ্রামে শূন্যরেখায় মায়ের কান্না
একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারত। মাঝখানে কয়েক গজের শূন্যরেখা। সেই শূন্যরেখাতেই আটকে আছে একটি পরিবারসহ মোট ৯ জন মানুষ। গতকাল ভোরে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি।
অনিশ্চয়তার ভার যেন সবচেয়ে বেশি এসে পড়েছে পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা আর চার বছরের ফাতেমা খাতুনের ওপর। ছোট বোনের কান্না থামছে না। বড় বোন ফাতেমাও ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বারবার কাঁদছে। দুই মেয়ের এমন অসহায় অবস্থা দেখে মা সুমি খাতুনের বুক ফেটে যাচ্ছে। কখনো ছোট মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন, কখনো বড় মেয়ের চোখের পানি মুছে দিচ্ছেন।
বারবার কেঁদে উঠছে পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা খাতুন। হয়তো সে জানে না সীমান্ত কী, জানে না রাষ্ট্রের সংজ্ঞা। সে শুধু জানে ক্ষুধা, রোদ আর মায়ের বুকের উষ্ণতা। কিন্তু সেই মা সুমি খাতুনও যেন অসহায়। কোলে শিশুকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, আর নিজের চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু একজন মা হয়েও যেন কিছুই করতে পারছেন না।
পাশেই দাঁড়িয়ে বাবা বিল্লাল। তার মুখে কোনো ভাষা নেই। শুধু অসহায় দৃষ্টি নিয়ে কখনো সন্তানদের দিকে, কখনো সীমান্তের ওপারে তাকিয়ে থাকছেন। হয়তো একজন বাবার সবচেয়ে বড় কষ্ট এটাই—সন্তানের কান্না শুনেও কিছু করতে না পারা।
মাথার ওপর তপ্ত সূর্য। কোথাও কোনো ছাউনি নেই। রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে ফাহিম ও হিমেল নিজেদের পরনের লুঙ্গি খুলে অস্থায়ী ছাউনি বানানোর চেষ্টা করছেন। লুঙ্গির সেই সামান্য ছায়াতেই একটু স্বস্তি খুঁজছে শিশুরা।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্তে ছুটে আসেন। বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে তারাও অবস্থান নেন। বেলা ১১টার দিকে দুই দেশের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে দাঁতভাঙা বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ঠান্ডু মিয়া এবং ভারতের ১৮৩ ব্যাটালিয়নের ঝালোরচর ক্যাম্পের ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার আলোচনায় অংশ নেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনা শেষে কোনো সমাধান আসেনি।
এপারে বিজিবি, ওপারে বিএসএফ। দুই বাহিনীর সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থানে। মাঝখানে ক্ষুধা, ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে ৯টি জীবন। সীমান্তে উপস্থিত অনেকের চোখেও জল। কারণ রাষ্ট্রের সীমারেখা মানুষ টানে, কিন্তু শিশুর কান্নার কোনো সীমান্ত নেই।
পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা জানে না সে কোন দেশের নাগরিক। চার বছরের ফাতেমাও জানে না কেন তাকে খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতে হচ্ছে। তারা শুধু জানে, তাদের ক্ষুধা লেগেছে, তাদের রোদ লাগছে, তারা মায়ের কোলে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়।
জয়পুরহাটে শূন্যরেখায় বৃদ্ধ
সীমান্তের শূন্যরেখার একটি ডোবায় বসে আছেন ৭০ থেকে ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। পরনে জরাজীর্ণ পোশাক, চোখেমুখে ক্লান্তি আর তীব্র পিপাসার ছাপ। আর তাকে পাহারা দিচ্ছেন দুই থেকে তিনজন বিএসএফ সদস্য। পরিকল্পনা ওই বৃদ্ধকে বাংলাদেশে পুশইন করার। কিন্তু বিএসএফের সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে বসেছে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসী। তাদের কঠোর অবস্থানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বিএসএফ। ওই বৃদ্ধকে নিয়ে ডোবার পাশে বসে রয়েছেন তারা।
ঘटनাটি ঘটছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার হাটখোলা সীমান্তের ২৭৯ নম্বর মেইন পিলারের ২৭ নম্বর সাব-পিলার এলাকায়। গতকাল সকাল ৮টা থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এই সীমান্ত এলাকা। সন্ধ্যা ৬টা পেরিয়ে গেলেও ওই বৃদ্ধকে একইভাবে রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, সকালে সীমান্তসংলগ্ন মাঠে কয়েকজন কৃষক কাজ করছিলেন। এ সময় ওই বৃদ্ধ তাদের কাছে এসে খাবার ও পানি চান। তিনি নিজেকে ভারতের নাগরিক পরিচয় দিয়ে জানান, ভোরের দিকে বিএসএফ তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। পরে কৃষকেরা বিষয়টি হাটখোলা বিজিবি ক্যাম্পে জানান। বিজিবি ওই বৃদ্ধকে ভারতীয় অংশে পাঠিয়ে দেয়। তবে বিএসএফ তাকে গ্রহণ না করে সীমান্তের শূন্যরেখায় একটি ডোবায় বসিয়ে রাখে। ডোবার এপারে বিজিবি সদস্য ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা অবস্থান নেয়। অপর পাশে বিএসএফ সদস্যরা ছিলেন।
হাটখোলা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বৃদ্ধ লোকটি তৃষ্ণার্ত ছিলেন। তিনি এপারে এসে পানি খেতে চেয়েছিলেন। তাকে পানি খাওয়ানো হয়। তিনি ভারতীয় নাগরিক। বিজিবির সদস্যরা এসে তাকে ভারতীয় সীমান্তে ফেরত পাঠান। কিন্তু বিএসএফ তাকে শূন্যরেখায় বসিয়ে রাখে।
ঘटनাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবির নায়েব সুবেদার মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএসএফ এক বৃদ্ধকে বাংলাদেশে পুশইন করেছিল। আমরা তাকে পুশব্যাক করেছি। তিনি ভারতের নাগরিক। অথচ বিএসএফ তাকে নিয়ে যাচ্ছে না।
কেকে/এলএ