দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আনাগোনা ও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিরাপত্তাহীনতাকে চরম রূপ দিয়েছে। সন্ত্রাসীরা যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করছে।
আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক বিরোধ, মাদক ব্যবসা ও জমিজমাসংক্রান্ত দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কোথাও আপনজনের হাতেই খুন হচ্ছেন স্বজন, আবার কোথাও গোষ্ঠীগত সংঘাতে ঝরছে প্রাণ। মাদকের বিস্তার এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে গেছে। শহরের কিশোর গ্যাং কালচার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। আবার রাজনীতিকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা অপরাধ ঘটাচ্ছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা পর্দার আড়ালে থেকে এসব ঘটনায় মদদ দিচ্ছেন। আর এর সব দায় বহন করতে হচ্ছে সেই দলকে। সামাজিক অস্থিরতা, মাদক বিস্তার ও আইনের প্রয়োগে দুর্বলতাই মূল কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধীরগতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলনের সময় বিপুল অস্ত্র ও গুলি লুট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যার একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র অপরাধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাদের মতে, অপরাধীদের লাগাম এখনই টেনে না ধরলে অবৈধ অস্ত্রধারীরা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল—এই চার মাসে এক হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ডের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পাঁচ ধরনের গুরুতর অপরাধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ২২১টি। তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অপরাধের মামলা দায়ের হচ্ছে দেশের বিভিন্ন থানায়।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। গত ৮ জুন রাতে মৌচাক এলাকায় হত্যা করা হয় ১৯ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের রমনা থানার সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদারকে। গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দেশের তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম খন্দকার নাঈম ইসলাম টিটনকে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর নিজ বাসার সামনে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন ঢাকার আরেক সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশ। মোটরসাইকেল আরোহী দুই সন্ত্রাসী কাইল্যা পলাশকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। মাথায় গুলিবিদ্ধ পলাশ এখন মৃত্যুর মুখোমুখি। গত ৯ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে তিন শিশুসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে, মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় ফারুক হোসেন (২৭) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। এ বিষয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি শামসুজ্জামান বলেন, সন্ত্রাসীরা ওই যুবককে আকস্মিক গুলি করে পালিয়ে যায়।
গত শুক্রবার দুপুরে খুলনার লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। ঘটনার সময় একটি মোটরসাইকেলে এসে হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। এ ছাড়া রোববার ভোরে খুলনা নগরীর দৌলতপুরে একটি মসজিদের ভেতরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা দুই মুসল্লিকে গুলি করে। খুলনা মহানগরে বর্তমানে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান চলমান। এর মধ্যেই প্রকাশ্যে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে খুলনা নগরে ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরসংলগ্ন জনতা ব্যাংকের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি করে মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনকে। এ সময় ১৪ হাজার ডলারভর্তি ব্যাগ লুট করে নেওয়া হয়। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানের একটি বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। খুনের শিকার মাসুদুল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ স্বপনের ছোট ভাই। বেলা আড়াইটায় বাজারের মধ্যে রিকশায় আসা সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করার পরও আতঙ্কে কেউ তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যায়নি। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেখানে পড়ে ছিল ওই নেতার লাশ। গত শনিবার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ঘরে ঢুকে মা ও মেয়েকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। দেশে বিপুল অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ধীরগতির কারণে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে।
এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আধুনিকায়ন এবং অপরাধ দমনে কার্যকর কৌশল দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল, যা যথাযথভাবে হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। সার্বিকভাবে, খুনসহ গুরুতর অপরাধের ঊর্ধ্বগতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের ধরতে থানা-পুলিশকে আরও বেশি তৎপর হতে হবে। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় অন্তঃকোন্দল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ হামলার ঘটনা ঘটে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র বলছে, দেশে অপরাধ বাড়ার মূলে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতাও রয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পর্দার আড়ালে থেকে সহযোগীদের পরিচালনা করছে। তাদের হাতে কয়েক হাজার অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জামিন পাওয়া এ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছে। অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে ফেরার। এদের বাইরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে গ্রেপ্তার না হওয়া জিসান আহমেদ ওরফে জিসান দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর মতিঝিল ও রামপুরাসহ আরও কয়েকটি এলাকায় ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি শুরু করেছে। তালিকাভুক্ত এসব সন্ত্রাসী এখন দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অপরাধজগৎ ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ নিয়ন্ত্রণ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, দেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। এসব অস্ত্রে খুনোখুনির কারণে সমাজে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে।
কেকে/এলএ