এদিকে ভারতের পুশইন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। বিএসএফের বেপরোয়া পুশইন ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষও পুশইন ঠেকাতে সক্রিয় রয়েছেন। এতে বিএসএফের ঠেলে দেওয়া নাগরিকরা শূন্যরেখা বরাবর আটকে যায়। এতে অবশ্য চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। বিশেষ করে এসব নাগরিকরা শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর অবস্থায় পড়ে যান।
অন্যদিকে বিজিবি ও স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে ঠেলে দেওয়া অনেক নাগরিককে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বিএসএফ।
বিএসএফের পুশইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের স্থানীয় বাসিন্দা ও মূলত বাঙালি মুসলমানদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।
এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, একদিকে বিএসএফের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে বিজিবির অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়ার অনড় অবস্থানের কারণে দুই দেশের ‘জিরো লাইনে’ (সীমান্তের শূন্যরেখা) বেশ কিছু পরিবার আটকা পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে তারা বিএসএফের পক্ষ থেকে শিশুসহ ২০০-র বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ঠেলে দেওয়ার অন্তত ২১টি চেষ্টা নস্যাৎ করেছে। গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি বলেছেন, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত, বাতিল ও বহিষ্কার) নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ‘ফিরে যেতে বাধ্য করা’ হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠুরভাবে পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রেখে তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের উচিত বেআইনিভাবে মানুষকে বহিষ্কার করা বন্ধ করা, পদ্ধতিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা এবং মুসলমানদের প্রতি এই হতাশাজনক বিদ্বেষের অবসান ঘটানো।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এমন নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যারা দেখেছেন কীভাবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী রাতের আঁধারে দলবেঁধে লোকজনকে সীমান্তে নিয়ে আসছে এবং কাঁটাতারের বেড়া কেটে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিজিবি প্রবেশ করতে না দেওয়ায় অবশেষে বিএসএফ সেসব মানুষকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
পঞ্চগড়ে গত ৫ জুন বিএসএফ শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করলে সীমান্তে দীর্ঘ ৭৫ ঘণ্টার এক মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘দলটি বাংলাদেশ সীমানার প্রায় ৫০ ফুট ভেতরে চলে এসেছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সতর্ক করে এবং বাহিনী পৌঁছানোর পর দলটি পিছু হটে নো ম্যানস ল্যান্ডের একটি বাঁধে অবস্থান নেয়।’
রুবেল হোসেন জানান, প্রথম রাতে ওই আটকে পড়া দলটিকে প্রচণ্ড বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বিএসএফের পক্ষ থেকে শুধু দ্বিতীয় দিনে তাদের কিছু শুকনো খাবার দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তে একাধিক পতাকা বৈঠক ব্যর্থ হয়, পরে বিএসএফ শেষ পর্যন্ত দলটিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’
একইভাবে ৬ জুন ভোরে ভারতের সীমান্তরক্ষীরা দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের তিন পুরুষ, দুই নারী এবং এক শিশুসহ ছয়জন সদস্যকে বাংলাদেশের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়। বিজিবি তাদের অনুপ্রবেশে বাধা দিলেও বিএসএফ তাদের ভারতে ফিরে যেতে দেয়নি। খোলা আকাশের নিচে এক রাত কাটানোর পর অবশেষে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নেয়। এ ছাড়া ৮ জুন ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্তে ‘জিরো লাইনে’ প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে আটকে থাকার পর গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
আসামের বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা রাজ্যের বাংলাভাষী মুসলমানদের প্রায়শই ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে আক্রমণ করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন : ‘আমরা তাদের সীমান্তের সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং আক্ষরিক অর্থেই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিই। এখন আসামে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে বেশ কয়েকজন অবৈধ বাংলাদেশি নিজ থেকেই ফিরে যেতে শুরু করেছে।’
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নত্তোর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সীমান্তে যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।
সিলেট-৩ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হতে এ পর্যন্ত বিএসএফের পুশইন করা দুই হাজার ৩৬৯ জনের মধ্যে দুই হাজার ১৭৫ জনকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। ১১ জনকে হস্তান্তর করা হয়েছে বিএসএফের কাছে। আর ১৮৩ জনকে পুশব্যাক করা হয়েছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিএসএফের ৩৬টি পুশইন চেষ্টাকে বিজিবি প্রতিরোধ করেছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, সীমান্তে পুশইন ও চোরাকারবারিদের রোধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে ‘বর্ডার কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ’ গঠন ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে বিএসএফের ‘পুশইন’ সীমান্তে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
সাইফুল হক বলেন, ‘বিএসএফ শিশু-নারীসহ কয়েকশ মানুষকে বলপ্রয়োগ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দিয়ে চরম অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এ মানুষদের একটা অংশকে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় ঠেলে দিয়েছে। খাদ্য, পানীয় ও চিকিৎসা না পেয়ে এদের কারও কারও জীবনাশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিএসএফের এসব তৎপরতা তাদের বাংলাদেশবিদ্বেষী আগ্রাসী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।’
সাইফুল হক বলেন, ‘উভয় দেশে অবস্থানরত বৈধ নাগরিকদের তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাবার বৈধ প্রক্রিয়া রয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে জবরদস্তি করে পুশইন করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাইলে অবিলম্বে ভারতের পুশইন ও সীমান্তহত্যা বন্ধ করতে হবে।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে যে, ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর) এবং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দ্য এলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশন (আইসিইআরডি) অনুযায়ী ভারত সবার অধিকার রক্ষা করতে এবং জাতি, বর্ণ বা জাতিগত উৎপত্তির ভিত্তিতে নাগরিকত্ব হরণ প্রতিরোধ করতে বাধ্য। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া যে কোনো নাগরিককে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘ভারতের উচিত এই নির্মম বহিষ্কার বন্ধ করা এবং উভয় সরকারেরই নিশ্চিত করা উচিত যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যেন কখনোই মানুষের মৌলিক মর্যাদার বিনিময়ে না হয়।’
কেকে/ এমএস