জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ধান বিক্রির সময় প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ২-৩ কেজি ‘ধলতা’নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আড়তদারের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে কৃষকদের সাথে আড়তদারদের স্বন্দ্ব লেগেই আছে। অনেক সময় কৃষক-আড়তদারের মধ্যে মারপিটের ঘটনাও ঘটছে।
সরকার নির্ধারিত যে কোনো পণ্যের ৪০ কেজিতে এক মণ হিসেব ধরা হলেও ধান বিক্রি করতে এসে কৃষকদের মণ পূর্ণ করতে ৪২-৪৩ কেজি পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ফলে কঠোর পরিশ্রমের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে কাঙ্খিত লাভ পাচ্ছেন না কৃষকরা। বরং প্রতিমণে ২-৩ কেজি করে বাড়তি ধান দিতে গিয়ে হাজার হাজার টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। সকালে আড়তদাররা যে দামে ধান ক্রয় করেন, বিকালে সেই দামেই ধানগুলো মহাজনদের ঘরে বিক্রি করে দেন। তারপরও তারা প্রতিমণে লাভ করে আসছেন। এভাবেই আড়তদাররা ‘ধলতা’ নামে কৃষকের ধান হাতিয়ে নিচ্ছেন।
তবে আড়তদাররা বলছেন ভিন্ন কথা, কাঁচা ধান বাড়ি থেকে হাটে নিয়ে আসতেই অনেকটা শুকিয়ে যায়, ওজনে কম হয়। সে কারণে ২-৩ কেজি বেশি নেওয়া হচ্ছে। এটাকে ‘ধলতা’ বলে না।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দেখা যায়, উপজেলার পাঁচশিরা বাজার, মাত্রাই বাজার, পুনট বাজার, মোলামগাড়ী হাট ও আহম্মেদাবাসহ ধান বিক্রির সময় আড়তদাররা কাঁচা বলে ওজনে কম হবে-এমন অজুহাতে প্রতি মণে শুকনা ও কাঁচা উভয়ের নিকট থেকে অতিরিক্ত ২-৩ কেজি করে ধান নিচ্ছেন। আবার দুই মণের বস্তায় ৫-৬ কেজি পর্যন্ত বাড়তি ধান রেখে দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ধানের আর্দ্রতা, শুকানোর পর ওজন কম হওয়া এমনকি পাটের বস্তার ওজনের অজুহাত দেখিয়ে কৃষকদের নিকট থেকে অতিরিক্ত ধান নিচ্ছেন।
অনেকে ধলতার ধান দিতে অনাগ্রহ দেখালে ঘরের ভিতরে বস্তা খুলে ঢেলে নেওয়ার ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকের সাথে আড়তদারের লোকজনদের মারপিটের ঘটনাও ঘটছে। এসবের কারণৈ কৃষকদের তোপের মুখে পরে আড়তদাররা অনেক সময় ধান ক্রয় বন্ধও রাখছে। ‘ধলতা’র বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ না করলেই আবার ধান ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এ অতিরিক্ত ধান নেওয়া হলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের কৃষক রাশিদুল আলম বলেন, ‘আমরা সাধারণ কৃষক রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই। কিন্তু ধানের ন্যায্য মূল্য পাই না। উল্টো প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ধলতা দিতে হয়, এতে আমাদের লোকসান আরও বেড়ে যায় এবং কৃষকের কষ্টের কথা কেউ ভাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাঁচ বিঘা জমিতে এবার বোরো চাষ করতে আমার প্রায় এক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। এরমধ্যে কয়েক দিনের ঝড়ে প্রায় দুই বিঘা জমির ধান গাছ মাটিতে শুয়ে গেছে। ফলনও কম হচ্ছে। তার ওপর ধান বাজারে বিক্রি করতে এসে আরও বিপাকে পড়েছেন। আজ ২৫ বস্তা ধান বিক্রি করতে আসছি। দুই মণ ওজনের প্রতি বস্তায় ৮৫ কেজি করে এনেছি। এখন ৮৮ কেজির কম নিবে না। না দিলে ধান নিতে চাচ্ছে না। ৫০ মণ ধানের ওপর ২০০ কেজি ধান বেশি দিতে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ ছেড়ে দিতে হবে।’
কৃষক কামিরুল বলেন, ‘এক মৌসুমে ধলতার নামে ১০-১২ মণ ধান বেশি চলে যায়। এত কষ্ট করে ফসল ফলাই, কিন্তু বিক্রির সময় একপ্রকার জিম্মি হয়েই ধান দিতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবাদ করলেই ব্যবসায়ীরা বলে, অন্য হাটে নিয়ে যান। তখন তো আরও বিপদে পড়তে হয়। কারণ, সব হাটেরই একই চিত্র। অধিকাংশ হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে এক ধরনের অলিখিত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা সমন্বয় করেই অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার এই নিয়ম চালু করেছে। তাদের তো আর লোকশান গুনতে হচ্ছে না। কারণ, যে দামে কৃষকদের নিকট থেকে ধান ক্রয় করছেন, আবার সেই দামেই তারা মহাজনদের ঘরে ধান বিক্রি করছেন। ধলতার ধানই তাদের লাভ হচ্ছে। এতে আড়তদার-মহাজন দুই পক্ষই খুশি। কৃষকেরা মুখ বুজে ক্ষতি মেনে নিচ্ছেন। প্রতিবাদ করলে অন্য আড়তে গিয়েও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে কৃষকদের।’
এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দাবি ,নতুন ধানে আর্দ্রতা বেশি থাকায় শুকানোর পর ওজন কমে যায়। তাই কিছু অতিরিক্ত ধান নেওয়া হয়।
আড়তদার এনামুল হক বলেন, ‘ধান শুকানোর পর প্রতি বস্তায় ২-৩ কেজি ওজন কমে যায়। তাই আগে থেকেই কিছু বাড়তি নিতে হয়। এটা যে আজকের নিয়ম তা নয়, আগে থেকেই এই নিয়ম প্রচলিত রয়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু বাজারে ওজন কারচুপি ও ‘ধলতা’র নামে অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার মতো অনিয়ম চলতে থাকলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় বাজার মনিটরিং ও সঠিক ওজন নিশ্চিত করা জরুরি।’
এ নিয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা বলেন, ‘নির্ধারিত ওজনের বাইরে পণ্য নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পাশাপাশি বাজার মনিটরিং জোরদার করার কথাও জানান তিনি।
কেকে/এমএ