নির্ধারিত সময়ের আগেই শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া, নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, ক্লাস চলাকালে ঘুমানো ও মোবাইলে ফেসবুক ব্যবহারে ব্যস্ত থাকাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবালের কাছে এসব অভিযোগ করেছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
জানা যায়, গত রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে চর ঈশ্বর ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়নকাজ পরিদর্শনে বের হন ইউএনও রাসেল ইকবাল। এ সময় দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের একটি সড়ক পরিদর্শন করছিলেন তিনি। তখন একদল শিক্ষার্থী তার কাছে এসে দাঁড়ায়।
শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে জানতে চাইলে তারা জানায়, তাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রায়ই ছুটি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করে তারা। একই সঙ্গে শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না, উপস্থিত থাকলেও ঠিকমতো ক্লাস নেন না, ক্লাস চলাকালে ঘুমান এবং মোবাইলে ফেসবুক দেখেন বলে অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের অশোভন আচরণের অভিযোগও করা হয়।
অভিযোগ শুনে ইউএনও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ে যান। তবে সেখানে গিয়ে কোনো শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, বিদ্যালয়ে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দেওয়া হয়। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না এবং ক্লাস চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। কোনো কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন বলেও অভিযোগ তাদের।
অভিভাবকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের ছেলে-মেয়েরা জানিয়েছে, শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না এবং যথাযথভাবে ক্লাসও নেন না। শিক্ষকরা যদি ক্লাস ফাঁকি দেন, ক্লাস চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন কিংবা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন, তাহলে তারা কী শিখবে? বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজল রানী পাল বলেন, “পরদিন থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তাই শিক্ষার্থীরা আগে ছুটি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই নির্ধারিত সময়ের একটু আগে ছুটি দেওয়া হয়েছে।”
তবে সহকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার কয়েকজন সহকারী শিক্ষকের ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমি আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে তদন্তও হয়েছে। কিন্তু এরপরও তারা নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনেননি।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, “নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে আমি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শনে বের হয়েছিলাম। ওই বিদ্যালয়ের সামনেও একটি রাস্তা ছিল। সেখানে যাওয়ার পর ছাত্রছাত্রীরা আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য দাঁড়িয়েছিল। তখন তাদের অভিযোগগুলো শুনি। পরে তাদের নিয়ে আবার বিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো শিক্ষককে পাইনি। বিষয়টি আমি শিক্ষা কর্মকর্তা ও তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বলেন, “অনিয়মের বিষয়ে আমরা অবহিত হয়েছি। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। কৈফিয়ত পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে ইউএনওর বিদ্যালয় পরিদর্শন ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কেকে/সাশ