তিস্তার ভাঙনে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জয়রামওঝা চল্লিশ সাল এলাকায় একের পর এক বসতভিটা ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। গত কয়েক দিনে ১৮ পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি ভাঙনের শিকার হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় আতঙ্কে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন এলাকা পরিদর্শন করলেও এখন পর্যন্ত ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে জয়রামওঝা চল্লিশ সাল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার প্রবল স্রোতে নদীর পাড় ধসে পড়ছে। কোথাও বসতভিটার একাংশ নদীতে চলে গেছে, আবার কোথাও ঘরবাড়ি রয়েছে ভাঙনের একেবারে কিনারায়। ভাঙনের কবল থেকে শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় কেউ ঘরের চাল খুলছেন, কেউ আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকেই গবাদিপশু অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ধানের ক্ষেত ও অন্যান্য আবাদি জমি।
স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি তিস্তার পানি বাড়ার পর নদীতে স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। পরে পানি কমতে শুরু করলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে চরের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। এতে সেতু রক্ষার বাঁধের সঙ্গে স্থানীয়দের উদ্যোগে তৈরি একটি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ওই রাস্তার পাশ থেকে শুরু হয় তীব্র ভাঙন। ধীরে ধীরে ভাঙন ছড়িয়ে পড়ে ধানের ক্ষেত ও বসতভিটায়।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ১৮ পরিবারের মধ্যে রয়েছেন বাবর আলী, গোলাপী, গোলজার, নুর ইসলাম, মতিয়ার, আহাদ আলী, জহুরা, আসাদুল, আব্দুল, মইনুল, শাহ আলম, নজু, মোন্নাফ, আবুল হোসেন, শফিকুল, দুলু, নুরল ও নাজমুল। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো শেষ মুহূর্তে ঘর রক্ষার চেষ্টা করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত আসাদুল জানান, কয়েক বছর ধরে চল্লিশ সাল চরে বসবাস করে চাষাবাদের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা। এবারের মূল বন্যায় তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে পানি কমার কয়েক দিন আগে তিস্তার স্রোত চরের দিকে ঘুরে যাওয়ার পর থেকেই ভাঙন শুরু হয়। প্রথমে রাস্তা, এরপর ধানের ক্ষেত এবং একপর্যায়ে বসতভিটাও ভাঙনের মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘৩০ শতক জমি ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় বন্ধক নিয়ে ওই জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু সেই জমিও নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন বন্ধক নেওয়া টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল হক জানান, এর আগে ছয়বার তার বাড়ি নদীতে ভেঙেছে। এবারও সবকিছু হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
সামাদ ও ছাপিয়া নামের দুই বাসিন্দা বলেন, ‘দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও অনেক পরিবারকে বসতভিটা হারাতে হবে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমিও নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।’
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে চল্লিশ সাল এলাকায় ভাঙন চলছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিবারের বাড়িঘর ও জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন এলাকা দেখে গেলেও এখন পর্যন্ত ভাঙন রোধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, ‘তিস্তার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আগে শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। নতুন করে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদেরও সহায়তা দেওয়া হবে।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক জানান, তিনি নতুন করে দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করবেন। পরিস্থিতি দেখে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেকে/এআই