জাতীয় সংসদকে বলা হয় গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। সংসদে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংকট-সম্ভাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনের সাম্প্রতিক আলোচনায় জনপ্রত্যাশা অনেকটাই প্রতিফলিত হয়নি। অনেক সংসদ সদস্যকে নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়েই সরব থাকতে দেখা গেছে, যা জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও অসন্তোষ তৈরি করেছে।
সাধারণ মানুষের ভাষ্য— যখন বহুমুখী সংকটে দেশ, তখন সেসব বিষয়ে জোরালো আলোচনা না করে সংসদে ‘ওয়াশিং মেশিন’, ‘মাইক্রোওয়েভ ওভেন’, ‘পর্দা’, ‘মুতা বিয়ে’, ‘রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত জীবন’ এবং সংসদ সদস্যদের ‘পোশাক ও ব্যক্তিগত’ প্রসঙ্গ নিয়ে হৈ-হুল্লোড় চলে। আর এতে জনগণের প্রত্যাশার তুলনায় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ সময় অপ্রাসঙ্গিক বিতর্কে ব্যয় হচ্ছে।
বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন দেওয়ার দাবি। গত বুধবার সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রসঙ্গ তুলে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটে এখনো দরজা-জানালার পর্দা লাগানো হয়নি। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যদের একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো দেওয়া হয়নি।
স্পিকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যরা সম্পূরক বাজেট পাস করেছেন, কিন্তু তাদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম কিছু সুবিধাও এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তাই তিনি পর্দা, ওয়াশিং মেশিন এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেন দেওয়ার দাবি জানান।
তার বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরদিন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর যে সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের সমস্যা, জনগণের দাবি এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরা উচিত। সেখানে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং পর্দার মতো বিষয় আলোচনায় আসা সংসদের জন্য বিব্রতকর।
আন্দালিব রহমান পার্থ আরও বলেন, বিদেশি গণমাধ্যম ও কূটনীতিকদের কাছ থেকেও তিনি এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। এমনকি সংবাদমাধ্যমে ‘জামায়াত এমপির ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ও পর্দা দাবি’ শিরোনাম দেখে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লজ্জা পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। তিনি রসিকতার সুরে বলেন, প্রয়োজন হলে তিনি নিজেই মাইক্রোওয়েভ ওভেন দিয়ে দেবেন।
তবে তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্য সবার জন্য একটি সুবিধার কথা বলেছেন। বিষয়টি সংসদের বাইরে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে তোলা যেত। কিন্তু সেটিকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে আক্রমণ করা উচিত হয়নি।
পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংসদে বিষয়টি না বললেও ভালো হতো, তবে এটি এমন কোনো অপরাধও নয় যে তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক করতে হবে। ভবিষ্যতে সবাইকে আরও সতর্ক হয়ে বক্তব্য দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এ ছাড়া জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা চলাকালে হঠাৎ করেই সংসদে উঠে আসে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে ঘিরে পুরোনো একটি বিতর্কিত ঘটনা। বিএনপির সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক বাজেট আলোচনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, মাওলানা মামুনুল হক সরকার পতনের কথা বলছেন, বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। কিন্তু গাজীপুরে নারীসহ ধরা পড়ার যে ঘটনা ঘটেছিল, সেটি আসলে কী ছিল— সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। একপর্যায়ে তিনি ‘মুতা বিয়ে’ প্রসঙ্গ উত্থাপন করে স্পিকারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চান। তার বক্তব্যের পরপরই সংসদে আপত্তি ওঠে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সঙ্গে সঙ্গে বলেন, যিনি সংসদে উপস্থিত নেই এবং যার জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তাকে নিয়ে এ ধরনের আলোচনা সংসদে সমীচীন নয়। তিনি আরও বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত জীবন বা বিতর্কিত বিষয় সংসদে আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত নয়।
পরে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, মামুনুল হক সম্পর্কে সংসদ সদস্য যে তথ্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। তিনি মুতা বিয়ে করেননি এবং যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে, সেটিও ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলামও বক্তব্যের আপত্তিকর অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানান। পরে স্পিকার সেই অংশ এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেন। এ সময় জামায়াতের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, একসময় মুতা বিয়ের প্রচলন থাকলেও বর্তমানে তা নিষিদ্ধ ও হারাম হিসেবে বিবেচিত।
এরই মধ্যে আরেক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কুমিল্লা-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়ার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তার নাম ঘোষণা করার পর বক্তব্য শুরু না করে তিনি জানান, তিনি বক্তব্য দেবেন না। কারণ হিসেবে তিনি অভিযোগ করেন, তার নির্ধারিত সিরিয়াল পরিবর্তন করা হয়েছে এবং তাকে অন্যদের তুলনায় কম সময় দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, চলমান অধিবেশনের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা। সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্ত্রীকে নিয়ে একটি পুরোনো ঘটনার বর্ণনা দেন।
একই সময়ে বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক প্রসঙ্গ টেনে আনেন, যা তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিরোধী দলের সদস্যরা আসন থেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। সংসদ কক্ষে হট্টগোল সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল হস্তক্ষেপ করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা কিংবা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সংসদে মন্তব্য করা উচিত নয়। পরে তিনি মনিরুল হকের বক্তব্যের সংশ্লিষ্ট অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন।
কেকে/এলএ