শনিবার, ২০ জুন ২০২৬,
৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
শিরোনাম: নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলায় উদ্বেগ      অপ্রাসঙ্গিক আলাপে উপেক্ষিত জনগণ      পুলিশের পোশাকের রং পরিবর্তন করে প্রজ্ঞাপন      প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিবর্তন হচ্ছে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম      প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের মামলায় কারাগারে সাংবাদিক রেজানুর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু      অস্ট্রেলিয়ার কাছে টি-২০ সিরিজ খোয়াল বাংলাদেশ      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সরকারের চার মাস
নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলায় উদ্বেগ
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ৯:৩০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিশেষ অভিযানেও আইনশৃঙ্খলা বিপর্যয়ের লাগাম টানা যাচ্ছে না। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্রের মহড়া, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্যের লড়াই ও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অপরাধীদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা আরও তীব্র হচ্ছে। আবার জামিনে মুক্ত হয়ে বাইরে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারে তারা একের পর এক হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠছে। সুযোগমতো যেখানে-সেখানে প্রতিপক্ষের ওপর তারা প্রকাশ্যে হামলা করছে, গোলাগুলি করছে। এতে জনমনে ব্যাপক হারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও প্রায় প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ দৌড়ঝাঁপের মাধ্যমে কাজ করছে, আসামি গ্রেপ্তারও করছে। তারপরও অপরাধ যেন কমছেই না।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে ভেঙে পড়বে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যাবে। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মনোবল হারিয়ে ফেলবেন। এজন্য এখনই সরকারকে নড়েচড়ে বসতে হবে। অপরাধ দমনে যা দরকার, তাই করতে হবে। কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না।

তারা আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই নড়বড়ে। আবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে কোনো কাজই ঠিকমতো করা সম্ভব হবে না। তাই সবার আগে সরকারকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর হতে হবে।

পুলিশের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দিনদিন বাড়ছে। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে। কোথাও কঠোর অবস্থানে গেলে আবার ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশ ট্যাগ দিয়ে হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কারণে অনেকটা নড়বড়ে পুলিশিং চলছে সারা দেশে। এ সুযোগটাই নিচ্ছে অপরাধীরা। সাধারণ মানুষও মনে করছে, সরকারকে কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে হবে।

জামিনে বেরিয়ে ফের বেপরোয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা : চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর একে একে জামিন পায় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। এদের মধ্যে রয়েছে মিরপুরের আব্বাস, মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলাল, বাড্ডার ফ্রিডম রাসু, হাজারীবাগের সানজিদুল ইসলাম ইমন প্রমুখ। এ ছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইনে বন্দি থাকা কমপক্ষে ৪২৬ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী জেল থেকে বেরিয়ে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। মুক্তি পেয়ে বেশির ভাগ সন্ত্রাসী পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড পুনর্গঠনে তৎপর হয়ে ওঠে। তারা এখন এলাকাভিত্তিক নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। সক্রিয় করছে পুরোনো ক্যাডার বাহিনী ও শুটার গ্রুপকে। জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হোয়াটসঅ্যাপ বা সিগন্যাল অ্যাপে বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে ব্যবসায়ীদের ভয় দেখায়। আর স্থানীয় সহযোগীরা টাকা সংগ্রহ করে।

এদিকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা গণহারে জামিন পাওয়ার পর ঢাকায় বেশ কয়েকটি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলাল বাহিনী জড়িত বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। গত বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুরের পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যার পেছনে এসেছে সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুনের নাম। ওই বছরের ১০ নভেম্বর আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুন হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার ইমনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ২৯ এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। তিনি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক। টিটন হত্যাকাণ্ডে ইমনসহ একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আলোচনায় এসেছে।

সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫ খুনে উদ্বেগ : এদিকে, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ উদ্বেগজনক হারে ঘটেছে বলে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। যদিও সরকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছে, প্রতিবেদনটি সঠিক নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নত হচ্ছে।

সম্প্রতি সংস্থাটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময়ে দেশে ৬০৫টি খুন এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত ‘অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র’ শীর্ষক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ ও এপ্রিল মাসে মোট ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩ হাজার ৪৯৬টি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আলোচিত সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশু ৪৯ থেকে ৭১ জন।

এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু সেটি স্থিতিশীল হচ্ছে না। ১৬-১৭ বছরের নির্যাতনের উদাহরণ টেনে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা প্রতিশোধপরায়ণ হচ্ছেন। অপরাধ অর্থনীতিতে আধিপত্যের লড়াই চলছে। সাধারণ মানুষও আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। পুলিশও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সরকারের সদিচ্ছার সমন্বয়, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের আইন মেনে চলতে বাধ্য করা এবং মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারলে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু এ জায়গাগুলোতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারকে আরও কঠোরভাবে উদ্যোগী হতে হবে, যাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আইন মেনে চলে।

অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি-খুনোখুনি, জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক : অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও খুনাখুনিও উদ্বেগ ছড়াচ্ছে জনমনে। চলতি বছরের তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬, রাজশাহীতে ১০৬ ও খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটনের মধ্যেও শীর্ষে ঢাকা। গত শুক্রবার ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। একই দিন খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভেতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পাঁচ-সাতজনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীর গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতাকেই দায়ী করেন সবাই। এর আগে রাজধানীতে ফিল্মি স্টাইলে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন ও টিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দেশে একের পর এক যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলো খারাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত জুলাই আন্দোলনের পর পুলিশের ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারে ভেঙে পড়েনি। যে ঘটনা ঘটছে, সেগুলোয় মামলা হচ্ছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, অপরাধ ঘটলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রিভেনশন পুলিশিং জোরদার করতে চেকপোস্ট, প্যাট্রোলিং ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও জোরালো অ্যাকশন প্রয়োজন হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ অপরাধ করলে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। আদালত আদালতের কাজ করেছেন, আমরা আমাদের কাজ করব।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  নড়বড়   আইনশৃঙ্খলা   উদ্বেগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close