‘হয় টেন্ডারে কাজ, না হয় মৃত্যু’— চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের সামনে টেবিলে বিদেশি পিস্তল রেখে এমন হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নগরের পাঁচলাইশ এলাকার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয়ে ঢুকে সশস্ত্র একদল মানুষ তাকে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে উন্নয়ন কাজের টেন্ডার দেওয়ার জন্য চাপ দেন। হুমকিদাতারা নিজেদের বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী বলে পরিচয় দেন।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটেছে গত ১৪ জুন (রোববার) দুপুরে। তবে ঘটনাটি এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি। অভিযোগ ওঠার পাঁচ দিন পরও এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়নি। ফলে সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকির ঘটনা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম জোনের কার্যালয় নগরের পাঁচলাইশ থানার সুগন্ধা আবাসিক এলাকার ডি-ব্লকের ১৬০ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মুখে মাস্ক পরা ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র দল কার্যালয়ে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে চারজন সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের কক্ষে ঢুকে পড়েন। বাকি সদস্যরা কার্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। এ সময় কক্ষে থাকা সেবাপ্রার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তিদের বের করে দেওয়া হয়। কক্ষে প্রবেশের পর তারা নিজেদের বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের লোক হিসেবে পরিচয় দেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে দুজন সঙ্গে থাকা বিদেশি পিস্তল বের করে নির্বাহী প্রকৌশলীর টেবিলে রাখেন। এরপর একজন বলেন, ‘আমরা বড় সাজ্জাদের লোক। সাজ্জাদ ভাই আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’ পরে তাদের একজন মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ কলে নির্বাহী প্রকৌশলীকে একজনের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ‘বড় সাজ্জাদ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, “আমার অনেক কর্মী আছে। আমার কর্মীদের একটু দেখবেন। কাজ দিবেন।”
এরপর উপস্থিত চারজনের একজন সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমাদের মনোনীত ব্যক্তি যদি আপনার দপ্তরের উন্নয়ন কাজের টেন্ডার না পায়, তাহলে আপনাকে দেখে নেওয়া হবে।’ এমন হুমকি-ধমকি দিয়ে তারা কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। যাওয়ার সময় ঘটনাটি কাউকে না জানানোর জন্যও নির্বাহী প্রকৌশলীকে শাসিয়ে যান বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার পর থেকে চরম আতঙ্কে দিন কাটছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের। তবে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শুক্রবার বিকেলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। এখন পর্যন্ত তারা আমাকে কোনো নির্দেশনা দেননি। এ কারণে থানায় কোনো জিডি কিংবা মামলা করিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে জুন ক্লোজিং চলছে। দপ্তরে অনেক কাজের চাপ রয়েছে। কাজের কারণে অন্য কিছু করার সময়-সুযোগ পাচ্ছি না।’ তবে সরকারি কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে হুমকি দেওয়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের পরও কেন তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক মহলে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আলী ইমাম বলেন, ‘চট্টগ্রামে নির্বাহী প্রকৌশলীকে কাজের জন্য টেবিলে অস্ত্র রেখে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টি অবগত হওয়ার পর বিস্তারিত বলতে পারব।’ অন্যদিকে, পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে কেউ হুমকি দিয়েছে— এ ধরনের কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রামজুড়ে বর্তমানে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, অস্ত্র প্রদর্শন, হামলা ও হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাহিনীটির সদস্যদের নাম বারবার উঠে আসছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চাঁদা না পেয়ে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনজন মুখোশধারী ব্যক্তি বাসার পেছন দিক দিয়ে এসে গুলি ছোড়েন। তাদের হাতে পিস্তল, সাবমেশিনগান (এসএমজি) ও শটগান ছিল। তিনটি অস্ত্র থেকে প্রায় ১৫ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর আগেও ২ জানুয়ারি একই বাসভবনে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া গত ১৩ জুন রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে। ওই হত্যাকাণ্ডেও সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের দায়ের করা মামলায় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত রায়হানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ওই বাহিনীর সদস্যরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হামলা ও খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত প্রায় দুই বছরে এ বাহিনীর সদস্যরা অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
কেকে/এলএ