ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রতিবন্ধী শিশু সাইদা আক্তারের (৮) মৃত্যু নিয়ে তোলপাড় চলছে। আহত শিশুটি শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুর ২টায় নিজ বাড়িতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সাইদা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার চেচুয়ার প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পুরো ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা রহস্যজনক বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। ঘটনায় জড়িত প্রভাবশালীরা এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছে। সূত্র মতে, ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফনের জন্য শিশু সাইদার পরিবারকে প্রভাবশালীরা চাপ দেয়। শিশুর বাবা সাইদুল ইসলামকে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দিয়ে লাশ দাফনে বাধ্য করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে বাড়ির পাশে প্রতিবন্ধী সাইদার লাশ দাফন করা হয়। এদিকে প্রতিবন্ধী সাইদা আহত ও মৃত্যুর ঘটনায় প্রধান শিক্ষক মো. নুর ইসলাম মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগ প্রেরণ করেছেন।
জানা যায়, গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রভাবশালী মহল পুলিশ ও সন্ত্রাসী নিয়ে চেচুয়া চন্ডিমন্ডপে প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে যায়। পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের দেখে প্রতিবন্ধী শিশুরা তটস্থ হয়ে ছুটোছুটি শুরু করে। এ সময় ৪-৫ জন শিশু কম-বেশি আহত হয়। তাদের মধ্যে 'সেরিব্রাল পালসি' রোগে আক্রান্ত প্রতিবন্ধী শিশু সাইদা আক্তার (৮) দেওয়ালের সঙ্গে মাথায় আঘাত পায়। খিচুনি দিয়ে রক্ত বমি করতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যায়। এ ঘটনায় প্রতিবন্ধী শিশু সুরক্ষা আইন-২০১৩ চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। ২ শিক্ষক তাৎক্ষণিক আহত সাইদাকে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করেন। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় প্রতিবন্ধী সাইদাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।
সূত্র জানায়, প্রতিবন্ধী শিশু সাইদা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিল। সে মুক্তাগাছার দুল্লা ইউনিয়নের চেচুয়ার ভালুক চাপুডের হতদরিদ্র সাইদুল ইসলামের মেয়ে। মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থার অবনতি ঘটে। প্রভাবশালী মহল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বাবা-মা এবং হাসপাতালের স্টাফ ম্যানেজ করে বৃহস্পতিবার ভোরে ডিসচার্জ ছাড়াই সাইদাকে বাড়িতে নেয়। মামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রভাবশালীরা এ কাণ্ড ঘটায় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ পরিস্থিতিতে একদিনের মাথায় শুক্রবার দুপুরে শিশুটি মারা যায়। সূত্র মতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবন্ধী সাইদাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
জানা যায়, মুক্তাগাছার চেচুয়া চন্ডিমন্ডপ প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চরম দ্বন্দ্ব চলছে। চিহ্নিত প্রভাবশালী মহল প্রতিষ্ঠানটি গ্রাস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। মহলটি জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা মো. নুর ইসলামের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে। সাজানো ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় মিথ্যা মামলা। গত ৪ জুন এ মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে গেলে শিক্ষক নুর ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১০ দিন পর তিনি জামিনে ছাড়া পান। জামিন শুনানির দিন রাজনৈতিক মামলায় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানালে বিজ্ঞ বিচারক নামঞ্জুর করেন। এর আগে বিদ্যালয় ও এলাকা ছাড়া করতে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ মুক্তাগাছা থানার ২টি রাজনৈতিক মামলায় শিক্ষক নুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করানো হয়। ১ মাস ২৭ দিন পর তিনি কারামুক্ত হন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন এবং আইনজীবীর শুনানিতে সন্তুষ্ট হয়ে কম সময়ের মধ্যে আদালত তাকে জামিন দেন। এ ধরনের রাজনৈতিক মামলায় সাধারণত ৬ মাসের আগে জামিন হওয়ার নজির খুব কম।
সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় মুক্তাগাছা থানার এসআই সহিদুল ওসমান মাসুম অন্য এসআইকে সঙ্গে নিয়ে প্রভাতী প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে যান। এ সময় প্রভাবশালী মো. জাকির হোসেন, এমরান মাসুদ কবীর, শফিকুল ইসলাম, টোকাই মানিক, মর্জিনা আক্তার, লাল চান, ফেরদৌস তাজ, মীর সবুর ও হৃদয় মিয়া কয়েকজন সন্ত্রাসী নিয়ে স্কুলে গেলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবন্ধীরা ছুটোছুটি করে। সাইদাসহ ৪-৫ জন কম-বেশি আহত হয়। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। শুক্রবার (১৯ জুন) বিকালে কথা হয় স্কুলের আশপাশের অর্ধশত মানুষের সঙ্গে। তারা জানান, চিহ্নিত মহল দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি গ্রাস করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতা নুর ইসলামকে ২ বার সাজানো ও মিথ্যা মামলায় জেল খাটানো হয়। তারা জানান, বিদ্যালয়ে ২ শতাধিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন ৩৬ জন। নুর ইসলাম নিজের টাকায় তিলতিল করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। তাকেই তাড়াতে চাচ্ছে চিহ্নিত মহল।
কেকে/এলএ