বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুব ইলাহীকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের টোল আদায় পয়েন্টের ইজারা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে। অভিযোগের মুখে ইজারা কার্যক্রম সাময়িকভাবে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসক।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, দরদাতা ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, টোল ইজারা কার্যক্রমে সর্বোচ্চ দর উপেক্ষা করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুয়া জন্মসনদ ও নাগরিকত্ব সনদ প্রদান, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি এবং রাজস্ব ক্ষতির মতো নানা অভিযোগও সামনে এসেছে।
জানা গেছে, গত ১২ মে ২০২৬ তারিখে নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন টোল আদায় পয়েন্ট ইজারার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে প্রায় ১৪০ জন ব্যবসায়ী অংশ নেন। দরপত্র ফরম বিক্রি থেকে ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় দেড় লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়।
ভুক্তভোগী দরদাতা সৈয়দ আকাশ অভিযোগ করেন, নিলামে টোল আদায় পয়েন্টের সর্বোচ্চ দর ওঠে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই দর বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে প্রায় ৬২ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা দেওয়ার কথা। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। এতে সরকার প্রায় ৫৮ লাখ টাকা রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দরদাতা বলেন, আমরা বৈধভাবে সর্বোচ্চ দর দিয়েছি। কিন্তু আমাদের দর উপেক্ষা করে গোপনে অন্যত্র ইজারা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক দরপত্র বিক্রি করে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা হলেও শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। তাদের দাবি, প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি ও একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে প্রশাসক মাহবুব এলাহীর বিরুদ্ধে আরও নানা অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদে দালালচক্রের মাধ্যমে মিয়ানমারের নাগরিকদের সনদ প্রদান, ভুয়া জন্মসনদ ইস্যু, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সুবিধা প্রদানের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের দাবি, এর আগে প্রশাসকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কামাল নামে এক ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করে জন্মসনদ ও নাগরিকত্ব সনদ প্রদানের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে এ ঘটনায় দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভুক্ত খাল পুনঃখনন প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়নেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, প্রকল্পের কাজ ও ব্যয়ের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। তারা এসব অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুব ইলাহী। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। টোল ইজারা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান সমালোচনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব প্রচার করছে। অভিযোগগুলোর বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, অভিযোগগুলো যেহেতু জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এবং সরকারি রাজস্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা জরুরি। তাদের মতে, সর্বোচ্চ দর কেন উপেক্ষা করা হয়েছিল, কার স্বার্থে কম মূল্যে ইজারা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল এবং অভিযোগে উল্লিখিত অন্যান্য অনিয়মের সত্যতা কতটুকু—তা তদন্তের মাধ্যমে জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দরদাতারা অবিলম্বে বিতর্কিত ইজারা কার্যক্রম বাতিল করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পুনরায় উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ওঠা অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন তারা।
কেকে/এলএ