গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ধানের খড় শুকানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিরোধের জেরে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে ১৪টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাজারজুড়ে তাণ্ডব চালায়। এতে ব্যবসায়ীদের দোকানপাট, মালামাল ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শনিবার (২০ জুন) ভোরে উপজেলার শান্তিরাম ইউনিয়নের ফোরকানিয়া বাজারে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, এ ঘটনায় প্রায় অর্ধকোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জানা যায়, ভোর ৩টার দিকে হঠাৎ বাজারের একটি দোকানে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন আশপাশের দোকানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের লেলিহান শিখায় একের পর এক দোকান পুড়তে শুরু করলে ঘুমন্ত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রাণান্ত চেষ্টা চালালেও তীব্রতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে সুন্দরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন মুদি ব্যবসায়ী মো. লেবু মিয়া। তার দোকানের প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। এছাড়া মো. আজিজুর মিয়া লালটুর মুদি ও ভ্যারাইটিজ স্টোরে প্রায় ৮ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদের মধ্যে মো. শহিদুল ইসলামের টি-স্টলে ১ লাখ টাকা, মো. আব্দুল মোহাইমেনের ওষুধের দোকানে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মো. আনওয়ারুল ইসলামের ওষুধের দোকানে ১ লাখ টাকা, মো. কামরুজ্জামান আকন্দের ওষুধের দোকানে ১ হাজার টাকা, মো. নওশা মিয়ার মুদি দোকানে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, মো. আল আমিন মিয়ার টেলিকম ব্যবসায় ১ লাখ টাকা, মো. মসলিম আলীর কাঁচামালের দোকানে ৯০ হাজার টাকা, মো. আল আমিন মিয়ার কফি হাউজ ও কনফেকশনারিতে ১ লাখ টাকা এবং মো. আব্দুর রশিদের মুদি দোকানে ৮০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া মো. জাহিদুল ইসলামের কীটনাশক ও সারের দোকানে ৭০ হাজার টাকা, মো. আব্দুল রহমানের কাঁচামালের দোকানে ৮০ হাজার টাকা এবং মো. নুরুল ইসলামের কাঁচামালের দোকানে ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় অর্ধকোটি টাকারও বেশি।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, ধানের খড় শুকানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। তাদের ধারণা, ওই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে। তবে তারা এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেননি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
লাল্টু স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘এর আগেও আমার দোকানে কয়েকবার চুরি হয়েছিল। নগদ টাকা ও মালামাল চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। এবার আগুনে দোকানের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বহু বছরের কষ্টে গড়ে তোলা ব্যবসা মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। এখন আমি একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেছি। এখন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব, তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। সরকারের সহযোগিতা না পেলে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের পক্ষে কঠিন হবে।’
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী লেবু মিয়া বলেন, ‘রাতের মধ্যে কে বা কারা আমাদের সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। দোকানের সব মালামাল আগুনে পুড়ে গেছে। বছরের পর বছর কষ্ট করে গড়ে তোলা ব্যবসা এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল। বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেছিলাম। এখন কীভাবে ঘুরে দাঁড়াব, তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছি। সরকারের সহযোগিতা না পেলে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।’
সুন্দরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন অফিসার মো. লিটন বলেন, ‘ভোর ৩টা ৪০ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। পরে সকাল ৫টা ০৩ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।’
শান্তিরাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবিএম মিজানুর রহমান খোকন বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তার জন্য চেষ্টা করা হবে।
কেকে/ এমএস