জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত ও সংস্কার কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তারা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে রাতের আঁধারে কার্পেটিং কাজ করছেন। নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে দিনের পরিবর্তে রাতে কাজ করায় এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার পুনট-মোসলেমগঞ্জ ভায়া শান্তিনগর রাস্তায় অনিয়মের এ ঘটেছে।
রাতে ঠিকাদারের লোকজন কার্পেটিংয়ের কাজ করছেন- এমন অভিযোগ পেয়ে শুক্রবার (১৯ জুন) দিবাগত রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওই রাস্তায় গিয়ে পাথর-পিচ বিছানোর দৃশ্য নজরে পড়েছে। এ সময় দেখভালের দায়িত্বে থাকা কাউকে দেখা যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার রাস্তার সংস্কার ও প্রশস্ত করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই নিম্নমানের ইট ব্যবহার করছেন। রাস্তাটি চওড়ায় আগে ছিল ৫ মিটার, বর্তমানে তা বেড়ে হচ্ছে ৮.৭ মিটার। পুরো রাস্তার একপাশে খনন করা হয়েছে। গর্তে বালির সাথে ইটের খোয়া দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে পূর্বের রাস্তার উপড়ানো পরিত্যক্ত পাথর, ইট ভাঙ্গার গুড়া (রাবিশ) ও মাটি। বর্তমানে পুরো রাস্তায় মাটির স্তর জমে রয়েছে। সেগুলো পরিষ্কার না করেই যৎসামান্য বিটুমিন ছিটিয়ে তার ওপর ঠিকাদারের লোকজন রাতের আঁধারে কার্পেটিংয়ের দায়সারা কাজ করছেন।
নিম্নমানের কাজ করায় এলাকাবাসী বাধা দিলে ঠিকাদারের লোকজন তাদের ওপর চড়াও হয়। এমনকি হুমকিও দেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে রাস্তাটির সংস্কার ও প্রশস্ত কাজ তদারকির অনুরোধ করেন তারা।
উপজেলা প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পুনট-মোসলেমগঞ্জ রাস্তার শান্তিনগর বাজার থেকে মোসলেমগঞ্জ বাজার পর্যন্ত ৭.৩৮ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার এবং একই রাস্তার একপাশে চওড়া করতে নতুনভাবে ৩.৭ মিটার প্রশস্তকরণে গত বছরের ৩ জুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। আর এই কাজে ব্যয় ধরা হয় ৮ কোটি ৩৫ লাখ ১৯৪ টাকা। সে অনুযায়ী কাজটির দায়িত্ব পান নওগাঁর ইথেন এন্টারপ্রাইজ। কাজটি গত বছরের ২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাজটি অনেক দেরিতে শুরু করেন। এখন পর্যন্ত কাজ শেষ করতে পারেননি। তবে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কাজটি শেষ করার জন্য তাড়াহুড়া করে কাজ করছেন ঠিকাদার। এতেই অনেক অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে।
ইথেন এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক নুর আলম বলেন, ‘যেহেতু কৃষি এলাকা, আর ইরি-বোরো কাটার মৌসুম, কৃষকের কাজে বাধা না সৃষ্টি করতে রাতে কাজ করা হচ্ছে। তবে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। আসলে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে তা মিথ্যা।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাস্তার কাজে নিয়োজিত একাধিক শ্রমিক বলেন, ‘আসলে আমাদেরকে যখন, যেভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে সেভাবেই করছি। রাত-দিন বলতে কিছুই নেই। দ্রুত কাজ সম্পূর্ণ করায় এখন মূল কথা।’
থল গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জোব্বার বলেন, ‘শুরু থেকে এই রাস্তায় তিন নম্বর ইট দিয়ে কাজ করছে। সাথে পরিত্যক্ত পাথর, রাবিশ ও মাটি দেওয়া হয়েছে। কাঁদা-মাটির উপরই বিটুমিন ছিটিয়ে কার্পেটিংয়ের কাজও করছে রাতের বেলায়। সকাল বেলা সেগুলো আবার পায়ের ঠেলায় ওঠে যাচ্ছে। এই কাজ দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী অফিসের কেউ থাকে না।’
উদয়পুর গ্রামের বাসিন্দা লাল্টু মিয়া বলেন, ‘সুযোগ বুঝে রাতের বেলায় যা খুশি তাই করছে ঠিকাদারের লোকজন। এখনই রাস্তার কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে, ছয় মাস পর এই রাস্তার কি যে অবস্থা হবে, তা এখনই বুঝা যাচ্ছে। রাস্তা সংস্কারের নামে সরকারের টাকা লোপাট করার পরিকল্পনা করছে ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার।’
উপ-সহকারি প্রকৌশলী (এসও) আবু জাফর বলেন, ‘প্রথমত রাতে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই। বন্ধের দিন, আমার অনুপস্থিতিতে কাজ করার প্রশ্নই আসে না। শুনেছি তারা রাতে কাজ করেছে, পুনরায় ওঠানো হবে।’
ইথেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ বলেন, ‘আমিতো আসলে সাইটে থাকি না। যদি রাতের বেলায় কার্পেটিংয়ের কাজ করে থাকে, তাহলে ভুল করেছে।’
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, কার্পেটিং এর কাজ রাতে করছে তা শুনেছি। একটু অপেক্ষা করেন, কাজ বন্ধ করার ব্যবস্থা করছি।
কেকে/এমএ