কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার প্রাণকেন্দ্র বাসস্ট্যান্ড কাঁচাবাজার সংলগ্ন কিশোরগঞ্জ-কটিয়াদী-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে এক বিশাল ময়লার ভাগাড়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ট্রাক, ট্রলি ও ভ্যানে করে এনে এখানে ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি ও বাজারের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য।
দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত স্থানে এভাবে বর্জ্য স্তূপ করে রাখার কারণে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ, অসহনীয় দুর্গন্ধ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ও যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, কটিয়াদী সদরের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাসস্ট্যান্ড ও কাঁচাবাজার এলাকার মহাসড়কের পাশজুড়ে জমে আছে বিশাল ময়লার স্তূপ। দূর থেকেই নাকে আসে পচা বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধ। শহরে প্রবেশের আগেই আবর্জনার এই দৃশ্য ও দুর্গন্ধ কটিয়াদীর সৌন্দর্য ও ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করলেও তাদের দুর্ভোগ যেন দেখার কেউ নেই।
জানা যায়, কটিয়াদী পৌরসভায় এখনো কোনো স্থায়ী ও আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন গড়ে ওঠেনি। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা সব ধরনের বর্জ্য এনে মহাসড়কের পাশের এই জায়গাতেই ফেলা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ২০ টন কিংবা তারও বেশি বর্জ্য এখানে জমা হয়। কিন্তু নিয়মিত অপসারণ, মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা কিংবা বৈজ্ঞানিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে ময়লার স্তূপ।
বছরের পর বছর ধরে একই স্থানে বর্জ্য ফেলায় পুরো এলাকাই যেন উন্মুক্ত ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড রোদে পচনক্রিয়া দ্রুত বাড়ায় দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ময়লার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালো, দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্যে পরিণত হয়, যা মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি সড়কও পিচ্ছিল হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, দুপুরের দিকে দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র হয় যে দোকানে বসে ব্যবসা করাই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় নাক-মুখ ঢেকে থাকতে হয়। দুর্গন্ধের কারণে অনেক ক্রেতাই বাজারে আসতে চান না। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি কর্মপরিবেশও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ময়লার স্তূপে মাছি, মশা ও বিভিন্ন রোগবাহী পোকামাকড়ের উপদ্রব ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। আশপাশের বসতবাড়ি, দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়ছে। শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
চিকিৎসকদের মতে, এ ধরনের উন্মুক্ত বর্জ্য থেকে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধু পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, মহাসড়কের প্রায় তিন ফুট জায়গা দখল করে ময়লা ফেলার কারণে রাস্তার কার্যকর প্রস্থও কমে গেছে। ব্যস্ত এই আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বড় যানবাহন চলাচলের সময় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনকে গতি কমিয়ে চলতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।
নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী শহীদ মিয়া বলেন, ‘অসহ্য দুর্গন্ধে চলাচল করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টের রোগীরা এই দূষিত বাতাসে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। অনেক সময় নাক-মুখ চেপে বা শ্বাস আটকে রাস্তা পার হতে হয়। এত বড় সমস্যা কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না?’
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর ইসলাম সুজন বলেন, ‘ময়লার স্তূপে মাছি, মশা ও বিভিন্ন রোগবাহী পোকামাকড়ের উপদ্রব ভয়াবহভাবে বেড়েছে। আশপাশের বাড়িঘর ও দোকানপাটে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ময়লার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্যে পরিণত হয়, যা মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।’
সচেতন নাগরিকদের মতে, একটি উপজেলা সদরের প্রবেশমুখে এভাবে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৌরসভাগুলোতে পরিবেশবান্ধব স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলার বিষয়টি নিয়ে আমি সম্প্রতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) মহোদয়কে সরাসরি অবহিত করেছি। এর আগেও এ বিষয়ে কয়েকবার লিখিতভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কের পাশে এভাবে বর্জ্য ফেলা সড়কের জন্য ক্ষতিকর এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। জেলা প্রশাসক বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’
অন্যদিকে স্থায়ী ডাম্পিং গ্রাউন্ড না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে কটিয়াদী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাবনী আক্তার তারানা বলেন, ‘পৌরসভা ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এত বছরেও স্থায়ী ডাম্পিং গ্রাউন্ডের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন হুট করে জায়গা চাইলে তা পাওয়া সহজ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে চুরিয়াকোনা এলাকায় খাস জমিতে ডাম্পিং গ্রাউন্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে সরকারি সিদ্ধান্তে সেখানে স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ায় সেই স্থানটি আর ব্যবহার করা যায়নি। বর্তমানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কারণে অধিকাংশ খাস জমি ব্যবহৃত হওয়ায় উপযুক্ত জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে জনবসতি থেকে দূরে এবং যাতায়াত সুবিধাজনক এমন নতুন স্থানের সন্ধান চলছে।’
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ থেকে এ বিষয়ে কোনো চিঠি পাইনি। তাই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগও করেনি। বিষয়টি নিয়ে সওজের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগের জেলা প্রশাসকের সময় যোগাযোগ হয়ে থাকতে পারে, তবে আমার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ বিষয়ে কোনো যোগাযোগ হয়নি।’
কেকে/এমএ